Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮ , সময়- ৫:০৫ পূর্বাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী ঢাকায় সংবর্ধনার দরকার নেই, জনগণ সুখে থাকলেই আমি খুশি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবর্ধনার দরকার নেই, জনগণ সুখে থাকলেই আমি খুশি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের মামলায় ৩৪তম রায়ের অপেক্ষা প্রধানমন্ত্রীকে গণসংবর্ধনা : সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অভিমুখে জনস্রোত নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট : ভেস্তে যেতে বসেছে যুক্তফ্রন্টের উদ্যোগ শেখের বেটি মোক নয়া ঘর দেল বাহে, মোক দেখার কাইয়ো ছিল না ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পটির সুফল পাচ্ছে সাতক্ষীরা ও কুড়িগ্রাম জেলার ৮,৯২৮ দরিদ্র নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণসংবর্ধনা দিতে প্রস্তুত আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দিল্লির গোলামি করতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি : গয়েশ্বর

কলসিন্দুরের পর


মোফাজ্জল করিম

আপডেট সময়: ৫ জানুয়ারী ২০১৮ ২:১৮ পিএম:
কলসিন্দুরের পর

গ্রাম এখন আর আমাদের ছেলেবেলায় দেখা খানাখন্দক, পাঁক-কাদা ভরা, ম্যালেরিয়া আক্রান্ত গ্রাম নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে না আসতেই আঁধারে ডুবে যাওয়া, কেরোসিনের কুপি জ্বলা সেই গ্রাম এখন রাত জেগে টিভি দেখে। তর্কে মেতে উঠে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে। ছোটরা হতে চায় সাকিব আল হাসান বা মাশরাফি বিন মর্তুজার মতো ক্রিকেটার। মেয়েরাও স্বপ্ন দেখে কলসিন্দুরের মেয়েদের মতো ফুটবলার হওয়ার।

এখন খুব কম বাড়িতেই শীতের হিমেল হাওয়া বা বর্ষার ঝাপটা বেড়ার ফাঁক দিয়ে বা চালের ফুটো দিয়ে ঢুকে ছোবল দেয় বিপন্ন গৃহবাসীকে। গ্রামের বাড়িগুলোর চেহারা-ছবি বদলে গেছে। আগে বাঁশের বেড়া আর খড়ের চালের ছাউনি ছিল শতকরা ৯০টি বাড়ির। এখন সচ্ছল পরিবারের বাড়ি হয়েছে পাকা দালান-কোঠার, নিদেনপক্ষে টিনের চৌচালা ঘর। গরিব-দুস্থরাও বসবাস করে মাথা গোঁজার মতো ছন-বাঁশের ঘরে। এখন আর এক মাইল হেঁটে গিয়ে কাজলা দীঘি থেকে খাবার পানি আনতে হয় না গৃহবধূকে; এখন সব বাড়িতেই অন্তত দু-একটি চাপকল হয়েছে। প্রায় সব বাড়িতেই হয়েছে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা।

গ্রামীণ জীবনে এই যে পরিবর্তনের ছোঁয়া তা দেখে আমরা শহরবাসীরা পুলকিত হই। আমাদের মধ্যে যারা সব কিছুতেই বাহবা নেওয়ার কাঙাল, তারা চটজলদি দাবি করে বসি, ‘এটা সম্ভব হয়েছে আমাদের সরকারের চেষ্টায়, দলের উদ্যোগে।’ আমরা ভুলে যাই, গ্রামীণ জীবনে এই নীরব বিপ্লব হঠাৎ করে হয়নি। কোনো একটি সরকার বা দল এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে না। একক কৃতিত্বের দাবিদার যদি কেউ হতেই হয় তবে তা আবহমান কালের অবহেলিত, বঞ্চিত গ্রামের মানুষরাই। তারা শুধু বেঁচে থাকার জন্য যুগের পর যুগ সংগ্রাম করে গেছে, এখনো করছে উদয়াস্ত রক্ত জল করা পরিশ্রমের মাধ্যমে। এরা বাংলার কৃষক, জেলে, তাঁতি, কামার, কুমার। শহরের কোলাহলে এদের আমরা দেখি না। কিন্তু এরাই দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ। এদের ফলানো ফসল খেয়ে আমরা বেঁচে আছি। এদের একটি ভোটের জোরে আমরা ক্ষমতায় যাই, দেশ শাসন করি। 

তারপর এরা বাঁচল কী মরল সে খবর রাখি না। রাখার প্রয়োজন মনে করি না। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্বটা চিরকাল ঠিকই পালন করে চলেছে। তাদের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সরকার-বেসরকার-এনজিও যে যাই বলে তারা তাই মনোযোগ দিয়ে শোনে ও মেনে চলে। কেউ তাদের সঙ্গে বেঈমানি করলে তারা তা ভুলে যায়। বরং আরেকটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আশায় যে যা বলে, তাই করে। এদের কাছে সরকার যায়, এনজিও যায়, নেতারা যায়। এরা সবার কথা শোনে। কাউকে ‘কথা খেলাপি’ বলে শরমিন্দা করে না। কিভাবে চাষবাসের উন্নতি হবে, ছেলে-মেয়েগুলো লেখাপড়া করে মানুষ হবে, তা তারা নিজেরা শিক্ষিত না হয়েও মনোযোগ দিয়ে শোনে এবং আমল করে। তাদের কারণেই স্বাধীনতার পরের ‘তলাহীন ঝুড়ি’ বাংলাদেশের ফসলের ঝুড়ি এখন উপচে পড়ছে। পাকিস্তানি আমলের শতকরা ২৫ জন শিক্ষিত বাংলাদেশে এখন শিক্ষিতের হার ৭০ জন। এসব সম্ভব হয়েছে এদেরই ত্যাগের, শ্রমের, শপথের বিনিময়ে। তাই বলছিলাম, বাংলাদেশের চেহারা-সুরত এমনি এমনি বদলে যায়নি। গ্রামের ১২-১৩ কোটি মানুষ বদলিয়েছে এই দেশের গ্রামকে। বাকিরা যারা শহরে থাকি, তাদের মধ্যে খেটে খাওয়া শ্রমিক-মজুররা বাদে আমরা সবাই সুবিধাভোগী।

২. বর্তমান প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা ধারণা করতেও পারবে না স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে কী ছিল গ্রামবাংলার অবস্থা। বিদ্যুৎ তো দূরের কথা, একটা হারিকেন কেনার সামর্থ্যও ছিল না বেশির ভাগ পরিবারের। একটু সচ্ছল পরিবারের ছেলে-মেয়েরা ছাড়া স্কুলেই যেত কয়জন। মেয়েদের বেলায় তো তা ছিল একেবারেই নগণ্য। যেন লেখাপড়া করার ব্যাপারটা ছিল নিতান্তই শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান শিক্ষার চল ছিল না বললেই চলে। আর কলেজ? সে তো ধূমকেতুর মতো এক-আধটা দেখা যেত গ্রামাঞ্চলে। সেই অবস্থা থেকে এখন যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে গ্রামগুলো, তাতে সর্বাগ্রে গ্রামবাসীকেই অভিনন্দন জানাতে হয়। তাদের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা ছাড়া নিশ্চয়ই এটা সম্ভব হতো না।

এ থেকে একটা জিনিস প্রমাণিত হয়। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, এমনকি এশিয়ারও কোনো কোনো দেশের মানুষের চেয়ে আমাদের গ্রামবাসীরা অনেক উদারচেতা। পরিবর্তনের প্রতি অনাগ্রহ, দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারে আপত্তি এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রতি তাদের ঔদাসীন্য তো নেইই, বরং নিজেদের আপাত ক্ষতি মেনে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে পিছপা নয় এই হতদরিদ্র মানুষগুলো। গ্রামের একজন শিক্ষাদীক্ষায় সম্পূর্ণ অনালোকিত মা জানেন তাঁর মেয়েকে স্কুলে পাঠালে হয়তো গৃহকর্মের চাপটা পুরোপুরি তাঁরই ওপর পড়বে, তবুও মেয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে, জাতীয় উন্নতির কথা চিন্তা করে মেয়েকে স্কুলে যেতে বাধা দিচ্ছেন না তিনি, বরং উৎসাহিত করছেন। এখানে অবশ্যই সরকারি কিছু কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা বলতেই হয়। যেমন—শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য, উপবৃত্তি ব্যবস্থা, বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুবিধা, বিনা মূল্যে পুস্তক বিতরণ কর্মসূচি ইত্যাদি। এর সুফল লাভ করেছে একটি দরিদ্র পরিবার। আর এর সুদূরপ্রসারী সুফল আসবে জাতীয় জীবনে।

গ্রামে গেলে যেসব দৃশ্য দেখে আমি সব সময় অভিভূত হই তার একটি হচ্ছে সকালবেলায় গ্রামের রাস্তায় স্কুল ইউনিফর্ম পরে দলবেঁধে মেয়েশিশুদের স্কুল গমন। কী সুন্দর সুশৃঙ্খলভাবে কলবল করতে করতে যে যায় মেয়েগুলো। আর শুধু স্কুলে যাওয়াই না, ছেলেদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে পরীক্ষার রেজাল্টও ভালো করে তারা। আর এখন তো স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় ছেলে শিক্ষার্থীর চেয়ে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। অথচ কয়েক দশক আগে এটা কল্পনাই করা যেত না। তখন মেয়ের বয়স ১২-১৪ হতে না হতেই অভিভাবকরা তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে অস্থির হয়ে পড়তেন। আর এখন বাল্যবিবাহ ঠেকানোর জন্য স্কুলের মেয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই রীতিমতো সংগ্রাম শুরু করেছে। এখন তারা বিয়ের পিঁড়ি নয়, একজন প্রশাসকের, সেনা কর্মকর্তার, পাইলটের আসন পেতেই বেশি আগ্রহী। শিক্ষক বা চিকিৎসকের পেশায় দাপট তো বহুকাল আগে থেকেই দেখিয়ে আসছে তারা। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে। শিগগিরই আমরা দেখব বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে অসংখ্য কলসিন্দুর স্কুলের ফুটবল দল অনুশীলনে মেতে উঠেছে, জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলে খেলছে তাদের সতীর্থরা। শুধু দরকার উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান। যাঁরা মেয়েদের এসব কর্মকাণ্ডকে বাঁকা চোখে দেখেন তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, মেয়েরা এভাবেই আপনার, আমার ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করে চলেছে, তাদের বাধা দেবেন না। তারা আমাদের বোঝা হয়ে না থেকে দেশ-বিদেশ থেকে মান-সম্মান-মর্যাদার বোঝা জয় করে আনছে, তাদের বাধা না দিয়ে সহায়তা প্রদান করুন। তাদের আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে দিন।

৩. গ্রামের অনেক বাড়িতে ফ্রিজ, টিভি—কোনো কোনো বাড়িতে এমনকি টয়লেট পেপারের ব্যবহার—বেশ কিছুদিন আগে থেকেই লক্ষ করে আসছি। এসব পরিবারের চিন্তা-চেতনায় কেমন একটা আধুনিকতার ছাপ এসেছে। তাঁরা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের ভালো স্কুল-কলেজে পাঠান লেখাপড়ার জন্য। পরিবারের সবার খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারেও তাঁরা স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠছেন।

তবে গ্রামের মহিলারা নিজেদের শরীর-স্বাস্থ্য সম্পর্কে চিরকাল উদাসীন। তাঁরা সন্তান লালন-পালন, রান্নাবান্না, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাযত্ন ইত্যাদি নিয়েই সব সময় ব্যস্ত থাকেন। নিজেদের দিকে তাকাবার যেন সময় নেই তাঁদের। একটু ভালো-মন্দ খাওয়া তো দূরের কথা, সময়মতো খাওয়াই হয় না তাঁদের প্রায় সবার।

সেই গ্রামীণ গৃহিণীদের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখলাম কয়েক দিন আগে বাড়ি গিয়ে। দেখি কী, প্রায় এক ডজন মহিলা শ্রীমঙ্গল-কুলাউড়া অঞ্চলের ডিসেম্বরের শেষার্ধের শীত উপেক্ষা করে সেই কাকভোরে বের হয়েছেন প্রাতর্ভ্রমণে। হ্যাঁ, একেবারে ঢাকার মহিলাদের রমনা পার্ক-ধানমণ্ডি লেকের মর্নিং ওয়াকের কায়দায়। পার্থক্য শুধু, গ্রামের এই খালাদের-ভাবিদের-বুবুদের শাড়ি-শাল-কার্ডিগানে শহুরে জৌলুস নেই মোটেই, নেই গয়নাগাঁটির বাহুল্য। অবশ্য ছিনতাইকারীদের ভয়ে শহরেও সোনা-দানার প্রাদুর্ভাব বড় একটা নেই এখন। গ্রামের নিতান্তই সাধারণ পরিবারের হাঁটুয়া বাহিনী মহিলাদের বেশভূষা আটপৌরে। তবে উৎসাহ-উদ্দীপনায় কমতি নেই মোটেই। সবাই রীতিমতো হাত-পা দুলিয়ে গল্প করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছেন মোটামুটি দ্রুততার সঙ্গে। গল্পের বিষয়বস্তু যথারীতি রান্নাবান্না, দ্রব্যমূল্য, বাচ্চাকাচ্চার অসুখ, বড় মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ ইত্যাদি।

প্রথম দর্শনে অবশ্যই একটু ধাক্কা খেলাম। যেখানে কয়েক যুগ আগে আমাদের মা-খালারা খুব ঠেকায় পড়লে এ বাড়ি-ও বাড়ি যেতেন, তাও রাতের বেলায় লণ্ঠন হাতে পুরুষ সঙ্গী নিয়ে, সেখানে এ যুগের মহিলারা দিনের বেলায় জেলা বোর্ডের রাস্তা দিয়ে চলছেন রীতিমতো প্যারেড করতে করতে। তাও কোনো জরুরি কাজে নয়, কেবল স্বাস্থ্যোদ্ধারের আশায়। ভালো লাগল দেখে, আমাদের গ্রামের মা-বোনেরা স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠছেন। এঁদের কাছ থেকে জাতি নিশ্চয়ই অনেক কিছু আশা করতে পারে।

৪. এতক্ষণ যা বললাম তা শুধু গ্রামবাংলার হাল আমলের ইতিবাচক দিকগুলোর কথা। এ থেকে নিশ্চয়ই একটা আশার আলো দেখতে পাই আমরা। আমাদের চিরচেনা অন্ধকারে ডুবে থাকা অনগ্রসর গ্রামবাংলায় জাগরণের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের দুর্বল সঙ্গী গ্রামবাংলাও উন্নয়নের ধারায় মিলিত হচ্ছে, নিঃসন্দেহে এটা একটা বড় রকম খুশির খবর। শিক্ষিতের হার বৃদ্ধি ও প্রসূতি মৃত্যুর হারে অধোগতির মতো সামাজিক সূচকে গ্রামের মানুষের সরাসরি অবদান আছে। এগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তাদের জন্য আরো প্রণোদনা সৃষ্টি করতে হবে।

তবে সবার আগে দূর করতে হবে কতগুলো সামাজিক প্রতিবন্ধকতা। এখনো বাল্যবিবাহ, যৌতুকপ্রথা ও নারী নির্যাতনের শিকার গ্রামের অসংখ্য অসহায় নারী। এখনো তথাকথিত সমাজপতিদের অন্যায় বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মধ্যযুগীয় শাস্তি ভোগ করতে হয় নিরপরাধ নারীকে। আর শুধু নারী কেন, গ্রামে বিচার নেই সমাজের নিচতলার সহায় সম্বলহীন পুরুষদের জন্যও। আর গ্রামে এই শ্রেণির নারী-পুরুষদের সংখ্যাই বেশি। ফলে গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই ন্যায়বিচারবঞ্চিত। শহরে বাস করে আমরা কল্পনাও করতে পারি না, গ্রামের অসহায় মানুষের জন্য থানা-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট, এই অফিসার সেই অফিসার, আকাশের চাঁদ ধরার মতো। আগে সামাজিক ন্যায়বিচার, ময়-মুরব্বির সালিস ইত্যাদি ছিল, এখন তাও চলে গেছে আতি নেতা-পাতি নেতাদের হাতে। তারা যা বলবে তা-ই আইন। আর তাদের আইনে মাতব্বরের ব্যাটার সাত খুন মাপ। সেটা ‘ইভ টিজিং’ বা নারী নির্যাতন—যে অপরাধই হোক।

এই বিচারহীনতা থেকে উদ্ধারের পাশাপাশি যেসব তথাকথিত সমাজপতি সম্মুখে অগ্রসরমান সমাজকে পেছন থেকে টেনে ধরতে চান তাঁদের অশুভ তৎপরতা থেকেও সমাজকে রক্ষা করতে হবে। দেশ যখন অপেক্ষা করছে কবে গ্রামের শিশু-কিশোরদের নাড়াক্ষেত পরিষ্কার করে ক্রিকেট মাঠ তৈরি করার মতো মেয়েরাও কলসিন্দুরের কিশোরীদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে ফুটবল খেলতে মাঠে নামবে, তখন যদি কেউ ‘গেল গেল’ রব তুলে ‘সমাজ রক্ষার’ জন্য এগিয়ে আসেন, তা হলে তা হবে পশ্চাদ্মুখিতা। এদের বিরুদ্ধে সময় থাকতেই সচেতন হতে হবে।

পরিশেষে একটি বিষয়ের উল্লেখ না করে পারছি না। নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় আছে বাংলাদেশে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এদের কার্যক্রম বিস্তৃত। কিন্তু গ্রামে? গ্রামে এদের দ্বারা সংগঠিত বা নিয়ন্ত্রিত কোনো ক্লাব বা সমিতি কদাচিৎ চোখে পড়ে। এদের কর্মকাণ্ড কি শুধু শহরকেন্দ্রিক হওয়ার কথা? আর কেউ না হোক, যদি গ্রামের অগ্রসরমান ‘মর্নিং ওয়াক বাহিনীর’ মতো সচেতন গোষ্ঠী এদের সাহায্য-সহযোগিতা চায় কোনো ব্যাপারে, যদি একটা মাতৃমঙ্গল ক্লাব বা প্রসূতি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রজাতীয় কোনো কিছু গঠন করতে চায় তা হলে কি উপজেলা বা জেলায় ছুটে যেতে হবে? উত্তর বোধ হয় হওয়া উচিত ‘না’। পর্বত মহাপুরুষের কাছে নয়, মহাপুরুষকেই যেতে হবে পর্বতের কাছে। আমাদের মেয়েদের ভেতর যে অমিত সম্ভাবনা আমরা দেখছি, তাকে একটু পরিচর্যা করলে দেখবেন তাদের কোনো অপশক্তিই দমিয়ে রাখতে পারবে না।

সবার জন্য রইল নববর্ষের অশেষ প্রীতি ও শুভকামনা।

 
লেখক : সাবেক সচিব, কবি


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top