Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৮ , সময়- ৫:১১ অপরাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
সংস্কৃতি অঙ্গনে কালো ছায়া নেমে এলো | প্রজন্মকণ্ঠ চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী আজ | প্রজন্মকণ্ঠ পবিত্র ওমরাহ পালন করেছেন প্রধানমন্ত্রী, দেশবাসীর জন্য দোয়া প্রার্থনা | প্রজন্মকণ্ঠ গিটারের জাদুকরকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভক্তদের কান্না আর ফুলেল শুভেচ্ছা প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে আজ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা | প্রজন্মকণ্ঠ আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন সংগীত যোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী : ওবায়দুল কাদের বিকল্প ধারার তিন শীর্ষ নেতাকে বহিস্কার করে নতুন কমিটি গঠন শহীদ মিনারে আইয়ুব বাচ্চুকে ভক্ত, অনুরাগীসহ সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদার হতে চান সৌদি যুবরাজ | প্রজন্মকণ্ঠ ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন ? প্রশ্ন কূটনীতিকদের  

ছাত্র রাজনীতির সেকাল, একাল, আগামির কাল : কেমন ছিল, কেমন আছে


মো: গোলাম সারওয়ার

আপডেট সময়: ৫ জানুয়ারী ২০১৮ ৪:৫২ পিএম:
 ছাত্র রাজনীতির সেকাল, একাল, আগামির কাল : কেমন ছিল, কেমন আছে

উপ-সম্পাদকীয় : আজ ছাত্রলীগের জন্ম দিন । ১৯৪৮ সালের আজকের এই দিনে এই নন্দিত সংগঠনটির জন্ম হয় । জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত ছাত্রলীগ বাংলাদেশের যতো অর্জন সবগুলোর অংশীদার হয়ে একটি গৌরবময় সংগঠনের দাবিদার হ‌য়ে উ‌ঠে‌ছে। বিশেষ করে ভাষা অান্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঐতিহাসিক এগার দফা, ফলত একদফা, হাজার বছরের বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধ এবং নিকট অতীতে নব্বইয়ের গণআন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে ।

ছাত্র রাজনীতির গোড়ার কথা :

উনিশ শতকের সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একটি ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন । তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার সঞ্চার করা । ঠিক সেই সময়ে আনন্দমোহন বসু ছাত্রদের রাজনীতিতে যোগদানের আহবান জানান এবং ছাত্রদের রাজনীতি বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদান শুরু করেন । কিন্তু তখনকার ভারতীয়দের অবস্থা ছিল বড়োই করুন । একদিকে দারিদ্রতা অন্যদিকে ব্রিটিস রক্ত চক্ষুর শাসন । একটি মামুলি চাকুরির জন্যে সামান্য কিছু বিদ্যা অর্জন ছিল অনেক অনেক বড় উচ্চবিলাস ।

১৯২৮ সালে কংগ্রেস সৃষ্টি করে নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি । প্রকৃতপক্ষে এটিই ছিল বাঙ্গালী ছাত্রদের প্রথম কোন সংগঠন । এ সংস্থার সভাপতি হন প্রমোদ কুমার ঘোষাল আর সম্পাদক ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত । উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পন্ডিত জওহরলাল নেহরু আর অতিথি বক্তা ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু । সংস্থার গঠনতন্ত্রের কাঠামো ছিল কংগ্রেসের আদলে তৈরি । একটি কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ও ১৯ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি নিয়ে সমিতির কাঠামো গঠিত হয় । গঠনতন্ত্রে উল্লিখিত না থাকলেও কার্যত নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি ছিল কংগ্রেসের ছাত্রফ্রন্ট ।

মুসলিম ছাত্রদের সংগঠন :

বিশ শতকের দ্বীতিয় দশকের প্রথম দিকে মুসলিম ছাত্ররা রাজনীতি করতো না । কারণ তাদের অভিভাবক এবং নেতারা তা’ তাদের করতে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না । তার পরেও কংগ্রেসের উদ্যোগে গঠিত নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকা শহরের কয়েকজন মুসলিম বুদ্ধিজীবী নিজেদের একটি ছাত্রসংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন ।

ফলে ১৯৩০ সালের ১২ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম ছাত্রদের একটি সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শহীদুল্লাহকে একটি মুসলিম ছাত্র সমিতি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ১৯৩২ সালে নিখিলবঙ্গ মুসলিম ছাত্র সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় । রাজনীতিতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা ছিল এ ছাত্রসংগঠনের ঘোষিত নীতি । এর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লে. কর্নেল এইচ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম ছাত্রদের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার আহবান জানিয়ে ছিলেন ।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৩৭ সালে গঠন করেন অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন এবং ওই বছরই কলকাতায় এর বঙ্গীয় শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় । অবশ্য ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে খুব কমসংখ্যক মুসলিম ছাত্রই এসব রাজনৈতিক সংগঠনে আগ্রহী ছিল ।

কিন্তু ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর এবং জিন্নাহর নেতৃত্বে বাংলায় মুসলিম লীগের বিস্তার ঘটলে ছাত্ররা মুসলিম লীগ নেতাদের অনুগামী হয়ে ওঠে । কলকাতায় ইস্পাহানি ও ঢাকায় খাজাদের ভবনগুলি ছাত্রদের ওপর মুসলিম লীগের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রে পরিণত হয় ।

১৯৩৮ সালে বাংলায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নতুন নামকরণ হয় অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ । পুনর্গঠিত এ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে ঢাকার আবদুল ওয়াসেক ও যশোরের শামসুর রহমান । এ মুসলিম স্টুডেন্টস লীগই পূর্ববাংলার মুসলিম ছাত্রদের ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে আকৃষ্ট করে। মুসলিম স্টুডেন্টস লীগই পাকিস্তান আন্দোলনে ছাত্রদের ব্যাপক যোগদান নিশ্চিত করেছিল ।


ছাত্রলীগের জন্ম:

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট দুই দিকে দুই ভূখন্ড নিয়ে পাকিস্তান নামক বিচিত্র দেশের জন্ম হয় । আর ১৫ই আগস্ট মাঝখানে জন্ম হয় ভারতের । পাকিস্তান কায়েম হওয়ার মাত্র এক বছর চার মাস বিশ দিন পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে জন্ম হয় ছাত্রলীগের । তখন সংগঠনটির নাম দেওয়া হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ।

তৎকালিন প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতা সম্পম্ন ছাত্র নেতা পরবর্তীতে বাঙ্গালীরা যাকে বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা নামে আখ্যায়িত করেন, সেই শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন সংগঠনটি । সংগঠনটির প্রথম আহবায়ক ছিলেন নাঈমউদ্দিন আহমেদ । ছাত্রলীগ সাংগঠনিক ভাবে কার্যক্রম শুরু করলে এর সভাপতি মনোনীত হন দবিরুল ইসলাম ও সাধারন সম্পাদক মনোনীত হন খালেক নেওয়াজ খান ।

ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম :

১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল আর একটি ছাত্র সংগঠন জন্মলাভ করে । তার নাম ছাত্র ইউনিয়ন । বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বসূচক ভূমিকা রাখতে পেরেছিল এই দুটো সংগঠন । পরবর্তীতে ছাত্র ইউনিয়ন বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের চেতনার চেয়ে বিশ্বসমাজতান্ত্রিক চেতনা লালন করার জন্যে দেশের মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে । তাছাড়া তাদের ভাষা ছিল অনেকটা দূর্বোধ্য । তাই তারা সাধারণ মানুষের হৃদয় ততটা স্পর্শ করতে পারেনি । কিন্তু ছাত্রলীগ নানা প্রতিকূলতার মাঝে এখনও দেশের প্রধান এবং বিশ্বের অন্যতম সংগঠন হিসেবে নিজেদের মহিমা ধরে রেখেছে ।

প্রথমেই ভাষার যুদ্ধ :

এই বাংলার ছাত্রদের প্রথম সফল এবং অহংকার করার মতো সংগ্রাম হলো ভাষার সংগ্রাম । মায়ের ভাষাকে সমুন্নত রাখার সংগ্রাম । জীবন দিলো মায়ের ছেলেরাই । অকাতরে । ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কংগ্রেস দলীয় সংসদ সদস্য ধীরেনন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন ।

পূর্ব বাংলায় যে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয় তার প্রথম সূচনা করেছিল ছাত্র সমাজ । তারা বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে ওই বছরের ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালন করে । ২ মার্চ ছাত্র সমাজই বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বাবের মতো রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে । নবগঠিত পরিষদ ১১ মার্চ হরতাল পালন করতে গেলে পুলিশের লাঠিচার্জে বহু ছাত্র আহত হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল আলমসহ বহু ছাত্রনেতাকে পাকিস্তানী শাসকরা গ্রেফতার করে ।

২১ মার্চের রেসকোর্সে পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্ররাই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করে এবং উপস্থিত ছাত্ররা ‘নো’, ‘নো’ শ্লোগানে সম্মেলন স্থলের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে । জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া বক্তৃতায় সুকৌশলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলেও ছাত্রদের মধ্য হতে আবারও ‘না’, ‘না’ ধ্বনি সম্বলিত প্রতিবাদ ওঠে ।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার সাহসী পদক্ষেপ ছাত্ররাই নিয়েছিল । তারাই মায়ের ভাষার দাবির জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল । তারই ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানি শাসকরা বাধ্য হয় বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দান কর‌তে ।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশক : উত্তাল সময়, মিছিলের সময়

বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে পঞ্চাশ ও ষাটের দশক হচ্ছে এককথায় স্বর্ণযুগ । ঐ সময়টা নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগ আর ছাত্র ইউনিয়ন । সে সময়ের ছাত্ররাজনীতি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিছিলের উত্তাল তরঙ্গ । শরীরের পশম দাঁড়া করানো শ্লোগানগুলোরও জন্ম হয় এই সময়ে । তখন কোন ধরনের লোভ লালসা ছাত্রনেতাদের প্রভাবিত করতে পারেনি । তাদের ভেতর কাজ করেছে দেশপ্রেম ও জনকল্যাণ। সেই আদর্শ বুকে ধারণ করে ছাত্রনেতারা এগিয়ে গেছে সামনের দিকে।

১৯৬২ সালে শরীফ কমিশন প্রণীত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে । দলীয় কর্মসূচির জন্য অপেক্ষা করে না তারা । কোন নেতা কি বললেন, কোন দল কি বললেন সেদিকে তাদের কোনো দৃষ্টি ছিল না ।

পাকিস্তানী সামরিক জান্তা আইয়ুব বিরোধী গণআন্দোলন সংগঠনে মূল ভূমিকা রেখেছিল ছাত্র সমাজ । ওই আন্দোলনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ এতো ব্যাপক ছিল যে, ওই আন্দোলন আইয়ুব খান বিরোধী শিক্ষা আন্দোলন নামে খ্যাতি লাভ করে । ছাত্রদের ওই শিক্ষা আন্দোলনই গণমানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়ে সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের গদিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল । লৌহ মানব বলে খ্যাত এই স্বৈরশাসক শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে বিদায় নিতে বাধ্য হন ।

১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লাহোরে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা ঘোষণা করলে ওই ছয় দফাকে পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় করে তুলেছিল ছাত্র সমাজ । কৃষক-শ্রমিক-মজুর সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কাছে ছয় দফার মর্ম, অর্থ ও তাৎপর্য তুলে ধরে ওই দাবিকে ছাত্রসমাজই মেহনতি মানুষের দাবিতে পরিণত করেছিল। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ছাত্রসমাজ তথা ছাত্রলীগ যদি সেদিন ছয়দফাকে বাংলার মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে না দিত, তবে স্বাধীন বাংলাদেশ পেতে আমাদেরকে হয়তো আরো অপেক্ষা করতে হতো ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর ছয়দফা কর্মসূচি এবং পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু হলে ছয়দফা সমর্থন ও শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ছাত্রদের মধ্যে এক নজিরহীন ঐক্য গড়ে ওঠে। এ লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালে সকল ছাত্রসংগঠন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে এবং ১১-দফা দাবিনামা উপস্থাপন করে । পরিষদ গোড়ার দিকে ১১-দফা দাবির জন্য আন্দোলন করলেও পরবর্তীকালে ছাত্রনেতারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখ‌তে শুরু করেন ।

পরিষদের নেতারা জাতীয়তাবাদী অর্থে ‘বাংলাদেশ’ নাম ব্যবহার করেন । তারা ‘জয় বাংলা’ এবং অন্যান্য জাতীয় স্লোগান ও প্রতীক উদ্ভাবন করেন । আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে জনসমাবেশে ছাত্ররা ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দান করেন ।

১৯৭১ সালের ১ মার্চের পরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলাদেশ জাতিসত্তার ধারণাগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অগ্রসর হয় । ১৯৭১ সালের ২ মার্চ তারা বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। পরদিন তারা পল্টন ময়দানে এক বিরাট জনসভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও শেখ মুজিবকে ‘জাতির পিতা’ ঘোষণা করে। একই সভায় ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। তারপরই শুরু হয় জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে জনগণকে সংগঠিত করার এক উদ্যোগ। শেখ মুজিবের সাতই মার্চের ভাষণ ছিল ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ।

ছয়দফা রাজনীতির আওতায় ২ মার্চ থেকে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ অসহযোগ আন্দোলন সংগঠনে আত্মনিয়োগ করে। ছাত্রদের এ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন এতই ব্যাপক ও বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি এতটাই সম্মোহক হয়ে উঠেছিল যে তাতে ছয়দফা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্যে এক প্রতীকী সম্পর্ক সৃষ্টি হয় ।

স্বাধীনতার পর :

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর শুরুটা ভালোই ছিল । ২৫ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে নতুন স্বাধীন দেশের ছাত্র সমাজ নতুন দেশ গঠনের শপথ গ্রহণ করে । যুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রথম দিনে ছাত্ররা ‘লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশ : এসো দেশ গড়ি’ শ্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে । ১৯৭৪ সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে বন্যা এবং বন্যা পরবর্তী দুর্ভিক্ষে ‘মানুষকে বাঁচান’ শ্লোগান তুলে স্বেচ্ছাসেবক ব্রিগেড গড়ে তোলা হয় ছাত্র সমাজেরই নেতৃত্বে । ছাত্ররাই বন্যা-উত্তর কৃষকদের বীজের জন্য বীজতলা তৈরি করে দেয় ।

ছাত্ররাজনীতি নষ্ট হতে থাকে মূলত স্বাধীনতার পর । ১৯৭৪ সালে মুহসীন হলে ছাত্রলীগের এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের সাতজনকে হত্যা করেছিল ব্রাশফায়ারে । সেই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি ছিলেন শফিউল আলম প্রধান । তিনি তখন তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক । আজকে তিনি অনেক বড় বড় কথা বলেন । জাতির এই প্রজন্ম হয়তো জানেন না তিনি একজন খুনী ।তিনি বর্তমানে বিশ দলের নেতা এবং জাগপা সভাপতি । সে সময় বিচারে তার কারাদণ্ড হয়েছিল । কিন্তু পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান তাকে সসম্মানে জেলখানা থেকে বের করে এনে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন।

জিয়াউর রহমান ছাত্র রাজনীতিতে নিয়ে আসেন গোয়েন্দা সংস্থাকে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানই প্রথম ১৯৭৬ সালে আইন করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ছাত্র, যুব, শ্রমিক, কৃষক ও অন্য সংগঠনগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে অঙ্গসংগঠন হিসেবে রাখার বিধান করেন । এর প্রভাব হয় ভয়াবহ নেতিবাচক । স্বাধীন ধারার রাজনীতির চেতনা ছাত্র ও পেশাজীবীদের মাঝে দুর্বল হয়।

ছাত্রলীগের গৌরবময় অতীত :

সে সময়ের ছাত্রলীগের নেতারা কেমন ছিলেন তার একটি নমুনা দেওয়া যেতে পারে । আবদুর রাজ্জাক একদিন তোফায়েল আগমদকে মোটরসাইকেলের পেছনে তুলে সংগঠনের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন । বাড়িওয়ালা আবদুর রাজ্জাকের কাছে তিন মাসের পাওনা ভাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। সে সময় আবদুর রাজ্জাক লজ্জিতভাবে অতি বিনয়ের সঙ্গে বাড়িওয়ালাকে বলেছিলেন, আমি আজকেই আপনার ভাড়া দিয়ে দেব, আপনি কিছু মনে করবেন না। সেখান থেকে বাড়িওয়ালার চাপের মুখে আবদুর রাজ্জাক তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু ভবনে ছুটে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন জেলে । আবদুর রাজ্জাক বেগম মুজিবের কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে ফিরে এসে বাড়িওয়ালার কাছে বাড়ি ভাড়ার সমুদয় টাকা বুঝিয়ে দেন এবং বাকিটা সংগঠন ও কর্মীদের পেছনে ব্যয় করেন।

এই ছিল ছাত্রলীগ । সিরাজুল আলম খান অর্থে, খাদ্যে, পোষাকে নিদারুন কষ্ট করতেন । তিনি এতোটাই কষ্ট সহ্য করতে পারেতেন যে ক্রমাগত দিনের পর দিন শুধু পানি খেয়েই কাটাতে পারতেন । কঠোর পরিশ্রম আর কৃচ্ছ সাধনের জীবন যাপন করতেন বলে অন্যরা তাকে কাপালিক বলতেন ।

মুক্তিযুদ্ধে হাজার হাজার ছাত্রলীগ কর্মী জীবন উৎসর্গ করেছেন । সন্মুখ সমরে শহীদ হয়েছেন ছাত্রলীগের ১৭ হাজার সাহসী বীর সৈনিক। বর্তমান জাতীয় রাজনীতির অনেক শীর্ষ নেতার রাজনীতিতে হাতেখড়িও ছাত্রলীগ থেকেই ।

বাংলাদেশে সামরিক আমল :

১৯৮৩ সা‌লে এরশাদের সামরিক আমলে শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দশ দফা তৈরিতে নেতৃত্ব দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ । শিক্ষার অধিকার প্রসারে শামসুল হক ও অধ্যাপক কবীর চৌধুরির কমিশনে রিপোর্ট তৈরিতে ছাত্রসমাজের পক্ষে জোড়ালো অবস্থান নেয় ছাত্রলীগ । তারপর ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের পালে বাতাস দেয় ছাত্রলীগ । তারই ফলশ্রুতিতে বিশ্ববেহায়া খ্যাত এরশাদ সরকারের পতন হয় ।

নিকট অতীতেও ইতিহাস আছে :

১৯৯৮ সালে ভয়াবহ বন্যায় দেশ নাকাল । একুশ বছর পর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসেছে । নিন্দুকেরা বগল বাজাচ্ছে । দুর্ভিক্ষ আবারও আসলো বলে ! ছাত্রলী‌গের বিরুদ্ধে অনেক বদনাম । কিন্তু সে সময়ে ছাত্রলীগ আবারও জোয়াল কাঁধে নেয় ।রশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তিন শিফটে রুটি তৈরি করেছে ছাত্রলীগ কর্মীরা । তৈরী করেছে দুর্যোগপুর্ন এলাকার মানুষের জন্য খাবার স্যালাইন। দুঃসময়ে দুর্গত এলাকায় রুটি ও স্যালাইন বিতরন করে মানুষের জীবন রক্ষা করেছে ছাত্রলীগ ।

১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদী আন্দোলনে ছাত্রলীগ ছিল আপোসহীন। নিরক্ষরতা মুক্ত, পোলিও মুক্ত বাংলাদেশ বির্নিমান ও বৃক্ষরোপনের মধ্যেমে বিশ্বের উষ্ণায়ন কমাতে প্রতিটি জেলায় জেলায় কাজ করেছে ছাত্রলীগ ।

এখন তবে হতাশা কেন ! :

এখন যেন সব বদলে গেছে । এখন আর দেখা যায় না ছাত্র সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় নিয়ে বা ছাত্রদের কল্যাণের জন্য, যেমন ভর্তি ফি কমানো, শিক্ষা উপকরনের দাম কমানো, বাজেটে শিক্ষার জন্য বরাদ্ধ বাড়ানো এবং একমাত্র মেধার ভিক্তিতে চাকরীতে নিয়োগ দানের জন্য আন্দোলন করতে ।

পঞ্চাশ- ষাট দশকে কেউ ছাত্র রাজনীতি করছে শুনলে মনে ভেসে আসে একজন মেধাবী, ইতিহাস- অর্থনীতি-সমাজ সম্বন্ধে সচেতন, নিষ্ঠাবান কোন তরুণ বা তরুণীর ছবি । আর অাজ শুনলে মনে হয় একজন সন্ত্রাসী, মেধাহীন, পাঠশূন্য, টেন্ডারবাজের চেহারা । অবশ্য এর পিছনে স্বাধীনতা বিরোধীদের নিরলস নেতিবাচক প্রচারনাও কাজ করেছে ।

কি করতে হ‌বে তবে :

ছাত্ররাজনীতিকে আবারও অগের অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে তাদেরকে বর্তমানের সমস্যাগুলোকে নিয়ে ভাবতে হবে । ভাবতে হবে সমাজ নিয়ে । রাজনীতি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় । রাজনীতি করবার জন্য সমাজ, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমরবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকা খুবই দরকার ।

সেজন্য আজকের ছাত্ররাজনীতিতে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের জন্যে নিয়মিত পাঠচক্রের আয়োজন থাকা প্রয়োজন । এ আয়োজন দল করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও করতে পারে । সেই সাথে এসব পাঠ চক্রে যারা ভালভাবে অংশগ্রহণ করবে তারা যেন ছাত্র রাজনীতিতে বেশি সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্রও তৈরি করতে হবে ।

সংসদগুলিকে কার্যকর করতে হবে। বছর বছর ছাত্র সংসদ মানেই জবাবদিহিতার ব্যাপার । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাস্তানতন্ত্র উচ্ছেদ এবং ছাত্র সংসদগুলো কার্যকর করাটাই তাই গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের বিষয় হওয়া উচিত ।

ছাত্র-রাজনীতিতে যারা অংশগ্রহণ করবেন তাদের নিয়মিত দৈনন্দিন বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কর্মকান্ডে অংশ নেওয়া উচিত । যেমন ক্যান্টিন পরিদর্শন, শিক্ষাঙ্গনের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার দেখভাল করা, ছাত্রছাত্রীদের পরিবহন সুযোগ-সুবিধার দিকে খেয়াল রাখা, ইত্যাদি । জাতীয় রাজনীতির অনৈতিক কর্মকান্ডের প্রতিবাদও করতে হবে । মোটকথা নতুন নতুন উদ্বাবনী আইডিয়া নি‌য়ে চিন্তা করতে হবে । তা’ না হলে রাজনীতি দুর্বৃত্ত আর ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যাবে । কারন রাজনীতি শিখতে হবে ছাত্রজীবনেই ।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের আটষট্রি বছরের জন্ম তিথিতে ফুলেল শুভেচ্ছ ।


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top