Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮ , সময়- ৪:৩৯ পূর্বাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী ঢাকায় সংবর্ধনার দরকার নেই, জনগণ সুখে থাকলেই আমি খুশি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবর্ধনার দরকার নেই, জনগণ সুখে থাকলেই আমি খুশি : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধের মামলায় ৩৪তম রায়ের অপেক্ষা প্রধানমন্ত্রীকে গণসংবর্ধনা : সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অভিমুখে জনস্রোত নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট : ভেস্তে যেতে বসেছে যুক্তফ্রন্টের উদ্যোগ শেখের বেটি মোক নয়া ঘর দেল বাহে, মোক দেখার কাইয়ো ছিল না ‘স্বপ্ন’ প্রকল্পটির সুফল পাচ্ছে সাতক্ষীরা ও কুড়িগ্রাম জেলার ৮,৯২৮ দরিদ্র নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণসংবর্ধনা দিতে প্রস্তুত আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে দিল্লির গোলামি করতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি : গয়েশ্বর

একজন 'ভাই' ত্যাগ, সফলতা, স্বার্থকতা


অনলাইন ডেষ্ক

আপডেট সময়: ১৩ জানুয়ারী ২০১৮ ৩:৩৫ পিএম:
একজন 'ভাই' ত্যাগ, সফলতা, স্বার্থকতা

একজন 'ভাই' ত্যাগ, সফলতা,স্বার্থকতা

আজ আমি ভীষন খুশি আর মহা আনন্দিত কারণ বড় ভাই 'ডিগ্রী' পাস করেছে। হয়ত ভাবছেন এ আবার তেমন কি? আমার কাছে এটা বিরাট কিছু কেননা এই ভাইয়ের ত্যাগেই আজকে আমি 'জজ'। আজকাল এমন ভাই কারও হয় কিনা সেটা কল্পনার বিষয়। কেনো লিখছি এই ভাই সম্পর্কে কেননা এটা বিরল

প্রবাহ-১ 

৯৯ সালে বাবা 'স্কুল শিক্ষক' রোড এক্সিডেন্টে মারা যান। আমি HSC  আর বড় ভাই B.COM পরীক্ষা দিয়েছি। আমি পাস করলাম, আর বড় ভাইয়ের ঘাড়ে সংসারের বোঝা চেপে যাওয়ায় ভাল করে উঠতে পারল না। শুরু হল সংগ্রাম। ওর কথা আর স্বপ্ন আমাকে ঘিরে। আমাকে বলল, তোকে সংসার নিয়ে ভাবতে হবে না। যদিও আমাদের সংসারে মা, ছোট বোন আর আমরা দুই ভাই ছাড়া আর কেউ নাই। মায়ের চেষ্টা কেউ যেন ছিটকে না পড়ি। বড় ভাই বলল আমাকে, তুই পিছনে তাকাবি না। আমিও আর পিছনে তাকাই নাই, একেবারে ভার্সিটি চান্স থেকে 'জজ' হওয়া পর্যন্ত। আর জজ হওয়ার পিছনে মায়ের পাশাপাশি আজকের এই ভাইটার অবদান সবচেয়ে বেশি এবং অনস্বীকার্য্য, এমন দৃষ্টান্ত নিতান্তই বিরল। তারই কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরার অপচেষ্টাই মাত্র। কেননা যার গুণ লিখে শেষ করতে কয়েকটা উপন্যাস লেখা হয়ে যাবে। 

প্রবাহ-২

পড়ালেখা মোটামুটি ইতি হয়েছিল ভাইয়ার, ইচ্ছা করলে বিয়ে করে সংসার পাততে পারত তখনই।
বিয়ের জন্য পিড়াপিড়ি কম ছিল না কিন্তু তার কথা, না বিয়ে করব না বিয়ে করলে ছোট ভাইকে মানুষ করতে পারবনা, আমার স্বপ্ন নষ্ট হয়ে যাবে। কারণ পরের মেয়ে এসে যদি বলে তোমার ছোট ভাইকে কেনো পড়াও ওকি তোমাকে কামাই করে দিবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। গ্রামের দুই একজন যদিচ বলত 'কিরে কফিল, ছোট ভাইরে পড়াইস কেনো? ও তো তোকে কামাই করে দিবে না! মানুষ বাপ মাকেই দেখে না, আরতো ভাই! ওকে পড়িয়ে লাভ কি। ভাইয়া বলতো, আরে ভাই আমি লাভের বা কমাইয়ের আশায় ছোটকে পড়াই না। ও নিজে তো ভাল চলতে পারব আর আমি তাতেই সুখী। আর আমি আমার নাম ফুটানোর জন্যও ছোটকে পড়াই না, ওতো সমাজে নামী দামী হবে আর তাতেই আমি খুশি। তখন একথাগুলোর মানে না বুঝলেও আজ বুঝি যে তখন কেনো ভাইয়া বিয়ে করতে রাজী হয়নি।

প্রবাহ-৩

আমি রাজশাহী ভার্সিটি পড়তাম যা বাড়ী থেকে প্রায় ৪০০ কিমি দূর। তখন মোবাইল ছিল না চিঠিই ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যম। মাসে অন্তত একটা চিঠি লেখা হতোই, বুজতেই পারছেন সেটা টাকা ফুরাইলে। আমার ভাইয়াকে দেখেছি এই চিঠির অপেক্ষা সে কখনই করতো না। সে এতই সচেতন ছিল যে ৫টি বছর আর কোন চিন্তা থাকলও টাকা নিয়ে আমাকে কখনও চিন্তা করতে হয়নি। দেখতাম মাসের ৪/৫ তারিখে পোস্ট অফিস থেকে পিয়ন একটা রেজিঃ খাম নিয়ে হাজির, মামা, আপনার টাকা আইছে কফিলউদ্দিন থেকে। আমি তখন হিসাব না করলেও এখন সেটা মিলাই আর মনে মনে চিন্তা করি আমি কি ভাইয়ার জায়গায় হলে এটা পারতাম বা করতাম? কোন ভাই কি আসলে এতটা করে বা করবে?

প্রবাহ-৪

ভার্সিটি শেষ বেকারত্ব দিয়ে চাকরী খোজা শুরু। গেলাম ঢাকা এবার শুরু আরেক জীবন। মনে হলো এবার বুঝি ভাইয়া আর সহযোগিতা করবে না। কিন্তু আমার ধারনা ফেল হল, দেখলাম তখনও আশপাশের মানুষ নানা কুবুদ্ধি দিতো, কি কফিল মিয়া, ভাইরে পড়াইলা, এখন কি, বেকার, আরকি বাদ দাও, নিজের চিন্তা করো, খেয়াল নিজের দিকে দাও ইত্যাদি ইত্যাদি। ভাইয়া মুখে একটু সুখ আর দূঃখের মিলনে একরকম হাসি হেসে বলতো, দেখলামই তো, শেষটাও দেখেই তবে ছাড়ব। ২০০৬ সালে  ভার্সিটি শেষ করে ২০০৭ সালে ঢাকায় পাড়ি, ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকা ছিলাম, কখনোই টাকার অভাব চোখে দেখিনি। কিভাবে ম্যানেজ করত আমার এই ভাইটা সেটা বুঝতে দিতই না। আম্মাকে মাঝে মাঝে জিগ্গাসা করলে বলত পিছনের ঐ গাছটা বেইচা (বিক্রি) কইরা দিছে, কখনও বাঁশ, কখনও পাট, কখনও ধান, কখনও গম, কখনও ফল ইত্যাদি। আমাদের গ্রামের মানুষ কেউ কেউ মারাত্মক হিংসা করত। কিন্তু ভাইয়াকে থামতে দেখিনি।

প্রবাহ-৫

২০০৯ সালের প্রথম দিকে ওকালতি শুরু করলাম। ২০১০ সালের ৫ম বিসিএস সার্কুলার জারি হল প্রিলি, লিখিত ভাইভা, মেডিকেল, পুলিশ ভেরিফিকেশন অবশেষে ২০১২ সালের ১লা আগস্ট  নীলফামারীতে 'সহকারী জজ' হিসাবে যোগদান। ভাইয়ার খুশি আর কে দেখে, ১ মণ মিষ্টি  কিনে খাওয়ালো। যোগদান করতে ভাইয়াকে সাথে নিয়ে গেলাম, কাছেতো এক টাকাও নাই, সেদিনও ভাইয়াই ভরসা। আমাকে নীলফামারী রেখে আসার সময় ৫০০০/ টাকা দিয়ে ছলছল চোখে বিদায় নিল। ভাইয়ার চোখে পানি আর আমার মুখে হাসি; হয়তো ভাইয়াও আমার চোখে পানিই কামনা করেছিল কিন্ত তার চোখে যে পানি সেটা যেনো আমি না দেখি সেটা ঢাকার কৌশল দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, পরক্ষণে আমি আর অশ্রু নিবারণ করতে পারিনি। ভাইয়া শুধু বলল, পাগল, তোর তো আজ আনন্দেরই দিন, নিজের দিকে খেয়াল রাখিস, বাড়ীর চিন্তা মোটেই করবি না ওটা আমিই সামলে নিব।

প্রবাহ -৬

ভাইয়ার বিয়ে দিলাম, সেখানেও আপওি কোন ধুমধাম চলবে না। নিতান্ত সাদামাটা বিয়ে হল। সংসার যাত্রা শুরু। এবার আমার পিড়াপিড়ি শুরু ভাইয়া তুমি ডিগ্রী ভর্তি হও, বলল অনেক দিন লেখাপড়া নাই, আরো কি হয় ইত্যাতি। আমি নছোর বান্দা, বললাম উন্মুক্তে ভর্তি হও। নানা ঘ্যান-ঘ্যান প্যান-প্যান তারপর উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে নাগেশ্বরী কলেজে ভর্তি। আমি এক রকম জোর জবরদোস্তি করে ভর্তি করাই, কেননা যে আমার জন্য এতকিছু করল আমি কি পারব না সমাজে তাকে গ্রাজুয়েট হিসাবে দেখতে, চাকরীর বয়স না থাক কিন্তু গ্রাজুয়েট হতে বাধা কোথায়। আমার এই ইচ্ছাটুকুও সে পুরন করে দিল। নানা চড়াই উৎরাই পেড়িয়ে গতকাল ভাইয়ার ডিগ্রী ফাইনাল রেজাল্ট হাতে পেয়েছি। তাই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না ভাবলাম ফেস বুকে একটু লিখি আর কিছু হোক বা না হোক দুই একজন তো পড়বেই। কাউকে পড়তে জোর করব না, যা লিখলাম তা পূরো সত্য, তাই তেমন কোন রসকস নাই। রসকসহীনভাবেই লিখলাম, অতি সংক্ষেপে, কারণ আমার ভাইয়ার গুণ আমার লেখা দ্বারা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। কারণ যেটুকু লিখেছি তা অতি অতি-নগণ্য। কিছু লোক ঈর্ষাবসে বলত, কি কফিল মিয়া, ছোটকে তো 'জজ' বানাইলা দেখি কেমন দ্যাখে তোমাকে?? আমার চাকুরীর সাড়ে ৫ বছর হলো, আমরা দুই ভাই একসাথেই আছি, পৃথক হইনি, দোয়া রাখবেন, যেন সারাজীবন একসাথেই থাকতে পারি। আমিও তাকে সেরকমই দেখি যেরকমভাবে সে আমাকে দেখেছে, আমি ১টা শার্ট কিনিনা, স্যুট ১টা তৈরি করি না, ২ ভাইয়ের জন্য ২টা, যা নেই দুই ভায়ের ২টা। এভাবেই চলছে আর চলেও যেন তাই সারাজীবন। ছবিটা ভাইয়ার আর পাশে তারই রেজাল্ট সীট।(শেষ নয়) 

আল্লাহ তুমি সহায় থেকো, ভাইয়া যেন আমার দ্বারা এতটুকুন কষ্ট না পায়।

যারা পড়বেন, ভুল হলে ক্ষমা করবেন, মনে কষ্ট নিবেন না, মনের আবেগটা ধরে রাখতে পারলাম না।

এস.এম. শফিকুল ইসলাম (সাগর)
সিনিয়র সহকারী জজ, দিনাজপুর।


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top