Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮ , সময়- ১১:৫৬ অপরাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
গত পাঁচ বছরে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে আ'লীগ সরকার | প্রজন্মকণ্ঠ #মি টু ঝড় এখন বাংলাদেশে  মুক্তি পেয়েছেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম নারায়ণগঞ্জে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা  আ'লীগের মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন বদির স্ত্রী শাহীনা ও রানার বাবা     ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী আইসিইউতে চিকিৎসাধীন জাতীয় পার্টির ভূমিকাকে ‘অকার্যকর' বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ ইসি সচিব ও ডিএমপি কমিশনারের শাস্তি দাবি করেছে বিএনপি চলচ্চিত্র পরিচালক আমজাদ হোসেনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রী আইসিসি টেস্ট র‍্যাংকিংয়ে সেরা অবস্থানে মুশফিক-মিরাজরা

আমি আগের ঠিকানায় আছি । প্রজন্মকণ্ঠ  


শামসুন্নাহার সুমি

আপডেট সময়: ৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ১২:৩৯ পিএম:
আমি আগের ঠিকানায় আছি । প্রজন্মকণ্ঠ  

ছোট গল্প : আজ শুক্রবার। সপ্তাহে শুধু এই দিনটাতেই একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠার বিলাসিতা করে দিপা। বাকি দিনগুলোতে একই রুটিন। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো, নাস্তা রেডি করা-গোসল, নিজের কলেজ, রূপকথার ভার্সিটি। আজ দেরি করে ওঠার পর হঠাৎ করেই যেন পঁচিশ বছর আগের সেই সকালটাতে চলে গেল সে।

সেদিনও একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছিল দিপা। ব্রাশটা হাতে নিতেই শুনতে পেল মাহমুদ জেঠার গলা। এই মানুষটা বাসায় এলেই প্রতিবার দিপা ভয়ে ভয়ে থাকে । কারণ প্রতিবার তার আসার একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে দিপার বিবাহ বিষয়ক কথোপকথন। দিপার মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করতো, চাচা আমাকে দেখতে কি আপনার এতই খারাপ লাগে যে আপনি আমাকে তাড়াতে উঠেপড়ে লেগেছেন? 

একটু এগিয়েই সেদিন বুঝতে পেরেছিল এবারের আলোচ্যসূচী এক এবং অভিন্ন। ড্রয়িংরুম এ বাবার সাথে বসে পাত্রের ফিরিস্তি দিচ্ছেন মাহমুদ জেঠা। দিপার এসব বিরক্ত লাগে এইসব তবু কৌতুহল বলে কথা। কিছুক্ষণের মাঝে আবিষ্কৃত হল এবারের পাত্রের নাম দীপ। পাঁচ ফুট দশ, ছিপছিপে, ব্রিলিয়ান্ট। ইলেকট্রিক্যাল বুয়েট। এমএস করার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি এক সমস্যায় বুয়েটেই এমএস করছে। মাহমুদ জেঠার বন্ধুর ছেলে। মা-বাবা নেই, নিজের বলতে দুই চাচা। কথায় কথায় আরও জানা গেল পাত্রপক্ষ দিপার বাবারও পরিচিত। 

মাহমুদ জেঠার আগের প্রস্তাবগুলোতে বাবার তেমন সাড়া না থাকলেও এবার বাবাও যেন উঠেপড়ে লাগলেন। প্রায় প্রতিদিনই দুপুর ও রাতের খাবার টেবিলে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা যেন ফিক্সড। দিপা তখন ইংরেজি ফাইনাল ইয়ার; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকেই আশেপাশে ঘুরঘুর করে কিন্তু পাত্তা নেই। কারণ একটাই ওর চুজিনেস; অথবা তেমন করে কেউ সামনে আসতে পারেনি কখনো। সেই দিপাও মাহমুদ জেঠার মুখে সব শোনার পর কৌতূহলবশত কাউকে জানতে না দিয়ে একদিন বুয়েটে গিয়েছিল।

ব্যাস, প্রথম দর্শনেই প্রেম। সেই থেকে নামটা বুকের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে ঘুরত। পাছে অন্য কারও ছায়া লাগে ওই নামের গায়ে। তখনও জানাজানি হয়নি পরিচিতদের মধ্যে। ইচ্ছে হত পদ্মপাতার মোড়কে করে জলের গভীরে লুকিয়ে রেখে আসে, কেউ যাতে সন্ধান না পায় মানুষটির। বিয়ে ঠিকঠাক হওয়ার পরের দু’মাস প্রায় প্রতিদিন দেখা করত দুজনে; প্রাকবিবাহ প্রেম, উদ্দাম। ও পক্ষেও আবেগ কম ছিল না। দীপ ওকে প্রতিদিন বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যেত। রোজ বাড়ি ফেরার পর স্বপ্নের মতো লাগত। মনে হত জীবনের মহার্ঘ্যতম প্রাপ্তি। এতটা পাবে, দিপা ভাবেনি কখনও। বিশ্বাস হতে চাইত না। একদিন বলেই ফেলল, 

: তোমার চারপাশে এত সব নক্ষত্র সদৃশ মেয়েরা থাকতে আমাকেই কেন পছন্দ হল বলো তো?
: তুমি খুব সেনসিটিভ বলে।
শুনে তখন মনে মনে উল্লসিত হয়েছিল, পরে একসময় এই ‘সেনসিটিভ’ শব্দটাই ব্যাঙ্গের মতো মনে হতে লাগল। যেন ঝাড়বাতির ভাঙা কাচ, একসময় উজ্জ্বল ছিল। এখন গায়ে লাগলে রক্তপাত। 

থইথই সুখের মাঝে বিয়ের দু বছর পর রূপকথা এল। ভালবাসার সমবাহু ত্রিভুজ। মনে হত, কেউ কাউকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকা সম্ভব না। দেড় বছরের রূপকথার মুখে যখন কথা ফুটছে আধো আধো, তখনই আবার আমেরিকা থেকে ডাক পেল দীপ। ওর তখন বিহ্বল অবস্থা। এক দিকে কেরিয়ার, অন্য দিকে ভালবাসায় উপচে পড়া সংসার। দিপাই উৎসাহ জোগাল। 
তবে দীপের একটাই সান্ত্বনা দিপাকে একটা নিজস্ব ঠিকানায় এ রেখে যেতে পারছে। ততদিনে নিজেদের বাড়ির সখ পূর্ণ হয়েছে তাদের। শহরের উপকন্ঠে বাড়িটা ছোট, কিন্তু গোছানো। একপরিবারের প্রয়োজনের পক্ষে যথেষ্ট। চারটা ছোট ছোট ঘর, একটা রান্নাঘর। তাছাড়া নিজস্ব আলাদা বাথরুম। চব্বিশ ঘন্টা পানির সুবিধা আছে। তবে যাওয়ার দিন দীপ-ই বেশি কাতর হয়ে পড়ছিল। অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে এয়ারপোর্টেই যেতে দিল না দিপাকে।
“এয়ারপোর্টে তোমাকে একা ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হবে। বাড়িতে, এই ছাদের নীচে তোমাদের দেখে গেলে নিশ্চিন্ত লাগবে আমার। আমার জন্যে ভেবো না, আনিস তো আছে ওখানে। ও রিসিভ করতে আসবে।”
হ্যাঁ, বড় নিশ্চিন্ত হয়ে চলে গিয়েছিল দীপ। সে দিনও এইভাবে গ্রিলের এ পাশে দাঁড়িয়ে দীপের চলে যাওয়া দেখেছিল। আর হাঁটুর কাছে আঁচল চেপে দাঁড়িয়েছিল দুই বছরের রূপকথা।

প্রথম দিকে প্রতিদিন মেল করত দীপ। যার বেশিরভাগ জুড়ে থাকত মেয়ে আর বউয়ের জন্যে হাহাকার। বাকিটুকু নিজের খবর। ক্রমেই বদলে যেতে লাগল চিঠির বিষয়। রূপকথা আর দিপা ক্রমেই প্রান্তবাসী হয়ে গেল। তবু কিছু ভাবেনি দিপা। অসুস্থ বাবা, ছোট রূপকথা আর নিজের কলেজ নিয়ে তখন হিমশিম। প্রায় দেড় বছর পর এক মাসের জন্যে এল দীপ। সাড়ে তিন বছরের রূপকথা তখন পাখি। কথা শিখেছে অনেক। আধো আধো পাকা কথাবার্তা দিয়ে সব আসরের মধ্যমণি। তবু ওর কলতানকে ছাপিয়ে অনেক বেশি সরব মনে হয়েছিল দীপের প্রবাসের গল্প। যার সিংহভাগ জুড়ে ছিল মিঃ ও মিসেস খানের কথা। দীপের পেয়িং হোষ্ট এবং ড. খান দীপের পি.এইচ.ডি কোঅর্ডিনেটর। দীপের কথার মধ্যিখানে প্রায়ই ঘুরেফিরে আসত ড. খান এর দায়িত্বহীনতা ও মিসেস খান এর সারল্য ও কষ্টসহিষ্ণুতার কথা। দীর্ঘ বিরহের পর দীপের মধ্যে অকুণ্ঠ ডুবে থাকা দিপা তখন অন্য কিছু ভাবার অবকাশ পায়নি। একটা মাসের সুখের উড়ান শেষ হতেই আবার খুলে পড়ল ডানা। সামনে লক্ষ্য ছিল-আর তো মাত্র বছর দুয়েক। এই বাড়ি, এর প্রত্যেকটা কোণ তখন থেকে প্রস্তুত হচ্ছিল দীপের ফেরার অপেক্ষায়। কিন্তু এখানে আর ফেরেনি দীপ। তবু এই বাড়িটার গায়ে সেই প্রতীক্ষার ছায়া এখনও ঝাপসা হয়ে লেগে আছে।

এর কয়েক মাস পরেই চিঠিটা এল, “এই মুহূর্তে ওর পাশে দাঁড়ানোর মতো এখানে কেউ নেই। ওর দু বছরের ছেলে মুগ্ধকে নিয়ে আমার কাছে চলে এসেছে। তুমি তো সব জানোই। ওদের আসলে আর কিছু করার নেই। তুমি খুব সেনসিটিভ, তুমি বুঝতে পারবে ওর অসহায়তা...।”
সেই শেষ। অামেরিকা থেকে এর পর কোনও চিঠি আসেনি। চিঠি বলতে ই-মেল। কিংবা এসেছিল হয়তো, দিপা জানে না। কারণ আর কোনদিন ওই মেল আই ডি খোলেনি ও। নিজের মতো করে একটা উপসংহার রচনা করে নিয়েছিল। স্নিগ্ধা ড. খানের স্ত্রী। দীপের চেয়ে অন্তত পাঁচ বছরের বড়। ড. খানের কাছে পিএইচ ডি করার সূত্রে ঘনিষ্ঠতা। ওদের অন্তরঙ্গতা কখনও বিচলিত করেনি দিপাকে। নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে, জীবনের ভাঁজে ভাঁজে এমন গভীরভাবে বুনে নিয়েছিল দীপকে, যে তা ভেদ করে কোনও সন্দেহ, অবিশ্বাস ওকে স্পর্শ করতে পারেনি।

স্পর্শ যখন করল, সেনসিটিভ মেয়েটি তখন তার সমস্ত ভালবাসা দিয়ে, হাহাকার দিয়ে শুধু এইটুকু বুঝতে পারল, দীপ অন্য কারও অসহায়তার সহায় হয়েছে। চারপাশ অন্ধকার লেগেছিল। তবু ভেঙে পড়তে পড়তেও রূপকথা আর বাবার কথা ভেবেই, কারও সহায়তা ছাড়াই উঠে দাঁড়াল। ব্যক্তিগত দুঃখবিলাসের সময় পায়নি। অতল কষ্টের সমুদ্র থেকে স্নান সেরে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করল। ভালবেসে যা একদিন অর্জন করেছিল, তাকে আগলে রাখার এক অভিনব শক্তি টের পেল নিজের মধ্যে। আর তখনই অনুভব করল-একজন মানুষ তার অবস্থান থেকে সরে গেলেও, তার মাপে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয় স্নেহ, প্রেম, ক্রোধ, অভিমানের মতো অবয়বহীন বিষয়গুলো দিয়ে তৈরি তার যে অস্তিত্ব , তাই দিয়ে ভরে থাকে সেই শূন্যতা। প্রতিদিনের অভ্যেসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার স্পর্শ। জড়িয়ে আছে।

এতকিছুর পরও দীপের অস্তিত্ব নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি দিপা। রূপকথা একটু বড় হবার পরই রুপকথাকে স্কুলে ভর্তি উপলক্ষে ঢাকায় বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দিল। প্রথমে ভেবেছিল জীবনের এই একমাত্র অবলম্বনকে এত সহজে ছাড়বে না। কিন্তু নিজের চাইতে আত্মজার সুযোগ-সুবিধা কে বেশি গুরুত্ব দেয়ায় এটা হয়ে ওঠেনি। শুণ্যঘরে প্রায়ই তার মনে হত এই বুঝি পাশে এসে দাড়িয়েছে দীপ। দুষ্টুমি করে পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরেছে কোমর। আর এসব ভাবতে ভাবতে সত্যি সত্যি শুণ্য ঘরে দ্বিতীয় অস্তিত্বের উপস্থিতি অনুভব করত দিপা। নিজের কাজ করতে করতে স্পষ্ট মনে হত-নিঃশ্বাসের শব্দ, সেই চেনা সিগারেটের গন্ধ, লাইটার জ্বালানোর মৃদু মৃদু আভা, বইয়ের পাতা ওলটানোর শব্দ। আচ্ছন্নের মতো চোখ বন্ধ করে বসে থাকত দিপা। ঘাড় ঘোরাতেও ভয় লাগত, পাছে এই বিভ্রমটুকু কেটে যায়।
ঠিক এমনসময় দুঃসংবাদটা নিয়ে এল আনিস। ক্যালাফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্ক আসার পথে রোড অ্যাকসিডেন্ট। জায়গাতেই সব শেষ। দীপ-স্নিগ্ধা। খবরটা শুনে দিপা কেঁদেছে কিনা আনিস জানে না। বরং দেখেছে খবরটি শোনার একমিনিটের মাথায় রূপকথাকে স্কুলের জন্য রেডি করে নিজেও বেরিয়ে পড়েছিল দিপা। এমন ভাবালেশহীন অভিব্যাক্তি দেখে আনিস তখন কিছুটা বিষ্মিতই হয়েছিল। আনিস দীপের বন্ধু। দীপ আমেরিকা যাবার পর আনিসের ওখানেই থাকত। আনিস বিয়েও করেছিল একটা, টেকেনি। এখন দেশে চলে এসেছে স্থায়ীভাবে। আনিস; দীপ আর দিপার প্রথমজীবনের প্রেম বিয়ে সবকিছুর স্বাক্ষী। 
এরপর থেকে আনিস প্রায়ই খোঁজ নিতে আসত। প্রথম প্রথম খোঁজ নিতে আসলে আনিসকে এমন অপ্রতিভ দেখাত যেন বন্ধুর অপরাধের দায়ে নুয়ে আছে। আর যখন যেভাবে পারত সেইসকল সাম্ভাব্য উপায়ে বন্ধুর কৃতকর্মের দায় পরিশোধের চেষ্টা করত সে। এভাবে অনেকগুলো বছরে আস্তে আাস্তে অসহায় বন্ধু পরিবারের সকল কাজের কাজীতে পরিণত হল আনিস। ছোট ছোট ভাললাগা দিয়ে গড়ে ওঠা একটা অন্তরঙ্গ প্রয়োজন ছিল, যা খুব স্বাভাবিকভাবেই মাঝখানের দূরত্বকে প্রতিদিন কমিয়ে আনছিল একটু একটু করে। এমনকি অন্তরঙ্গতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে একটু বড় হওয়া রূপকথাও আনিস আঙ্কেলের মধ্যে তার বাবার ছায়া দেখত। এই কথা অবশ্য দিপা জেনেছিল অনেক পরে, যেদিন একুশ বছরের রূপকথা তার মায়ের আপাত অসুখী জীবন নিয়ে নিজের গর্ভধারিনীকেই অভিযোগ করে বসল।

: মাম এমন তো অনেকেরই হয়। আমি বুঝি তোমার ইমোশনটা তবু আমি তোমার জায়গায় থাকলে নিজে সুখী হওয়ার চেষ্টাই করতাম। 
দিপা তখনও চুপ। রূপকথা বলে চলছে
: এইজন্য আমি তোমাকেই দোষ দেব মাম, সবার আগে ভালোবাসতে হয় নিজেকে। এমনতো না যে তোমার ব্যাপারে কেউ ইন্টারেস্টেড ছিল না। তোমার মনে আছে ছোটবেলায় আমি যখন বাবাকে খুঁজতাম তখন আনিস আঙ্কেলই আমার সব চাওয়া মিটিয়েছিল। আমার হারিয়ে যাওয়া গল্পের বাবাকে আমি উনার মতো ভাবতাম। উনি তো তোমার ব্যাপারে বেশ ইন্টারেস্টেডও ছিলেন। আমি সরি তবু বলছি, তুমি ওনার ব্যাপারে একটা ডিসিশনে আসলেও পারতে। 

দিপা মনে তখনও অনেক ভাবনা একইসাথে অনেক স্মৃতি। ছোটবেলায় রূপকথা মাঝে মধ্যে ‘বাবা কবে আসবে’, ‘বাবা কেন আসছে না’, এই সব বলে বিরক্ত করত। দাদু ওকে বোঝাতেন-‘বাবা খুব বিরাট স্কলার তো, তাকে অনেক বড় বড় কাজ করতে হয়, তাই আসতে পারে না।’ কী বুঝেছে ও-ই জানে, মেনে নিয়েছে। আর প্রতিদিন নিজের কল্পনা দিয়ে আবার বাবার সাহচর্য রচনা করে নিয়েছে। দীপ যে চেয়ারটায় বসে পড়াশুনা করত, তার সামনে দাঁড়িয়ে আপন মনে কখনও বলত-‘বাবা, রূপকথা আজ অ্যাপল লিখেছে। আজ রূপকথাকে দুটো ক্যাডবেরি দেবে আর বেশি বেশি আদর করবে।’ কখনও বলত‘-বাবা রূপকথার এখন ঘুম পাচ্ছে না, তুমি রূপকথাকে গল্প বলো।’ ছোটবেলায় থার্ড পার্সনে কথা বলত রূপকথা ।
রূপকথার এই কল্পনাপ্রবণতায় প্রথম প্রথম হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত দিপা। ধীরে ধীরে কখন যে ও নিজেই ঢুকে পড়ল ওই মায়াময় বিভ্রমে, নিজেই টের পায়নি। বাবার জন্যে রূপকথার আকুলতা কমে গেল স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর। ওর নিজের জগৎ তৈরি হতে শুরু করেছে তখন। কিন্তু দিপা ডুবে থেকেছে এই অদ্ভুত খেলায়। রূপকথা ওকে এই ডুবসাঁতারের দেশে একা পিছনে ফেলে একটু একটু করে পা রেখেছে জীবনের বাস্তবতায়। চারপাশ থেকে জীবনের উপকরণ সংগ্রহ করে ধীরে ধীরে এক অন্য রূপকথা হয়ে উঠেছে। যার কাছে বাবা শুধু একটা আবেগহীন উচ্চারণ মাত্র। চলতে চলতে হোঁচট খেলে হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছে আনিস। অবয়বহীন এক বায়বীয় অস্তিত্বের চেয়ে একজন রক্তমাংসে গড়া মানুষকে ওর গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। কিন্তু দিপা আনিসকে আসতে দিয়েছে, বসতে দেয়নি ওর জীবনে। যেখানে যেখানে দীপের চিহ্ন লেগে আছে, সেই জায়গাগুলো সন্তর্পণে আড়ালে রেখেছে। 

তবু আনিস এলে হঠাৎ হঠাৎ মনে হতো, ওর কল্পনাময় খানিকটা অবাস্তব জীবনে প্রবেশ করল একটা অন্যরকম হাওয়া। যা একজনের দীর্ঘশ্বাস অন্যজনের কাছে বয়ে নিয়ে যেতে পারে। যা খুব মৃদু উষ্ণতায় দিপার রক্তমাংসের অস্তিত্বটাকে ছুঁয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে একটা অদ্ভুত তোলপাড় চলে। মুখোশের মতো মনে হয় বাইরের শীতলতাকে। মনে হয়, এই মানুষটা দীর্ঘ পনেরো বছর শুধু একজন সহযাত্রীর মতো পাশে পাশে হেঁটেছে, সে যদি হাত ধরে হাঁটত-খুব কি খারাপ কিংবা বেমানান হত? কিন্তু কেন জানি এমনটা ঘটেনি! দিপার মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে তাহলে কি তার মতো আনিসও কি নিজের সঙ্গে দীপের ছায়াকে বহন করে চলেছে? হ্যাঁ একথা সত্যি যে আনিস তার ব্যাপারে অনেকখানি এগিয়েছিল। 
দিপার মনে পড়ে যায় রূপকথার এসএসসির রেজাল্ট ডিক্লেয়ার হবার পর আনিসই প্রস্তাব করেছিল অনেকদিন তো কোথাও বেড়ানো হয় না চল কোথাও থেকে বেরিয়ে আসি। রূপকথা একবাক্যে নেচে উঠেছিল। কিন্তু দিপা রাজি হতে চায়নি। রূপকথার এডমিশন ও নিজের কাজের চাপের কথা বলে এড়াতে চেয়েছিল। হয়তো বরাবরের সন্নাসীনি মন ছোট্ট এতটুকু সুখেও সাড়া দিতে চায়নি। রূপকথা শুনে রাগ করে চলে গিয়েছিল নিজের ঘরে। তখন আনিস ই তাকে রাজি করানোর চেষ্টা করছিল। দিপা নিস্পৃহ। একপর্যায়ে আনিস তার হাত রেখেছিল দিপার হাতে, তোমাকে আমি কখনো কিছু রিকোয়েষ্ট করিনি। একদিনের জন্যই তো , না করো না। বলেই হাত ছেড়ে দিয়েছিল। মুহূর্তের আবেশ, একপলের সুখের অনুভব। কেউ জানল না দিপা নিজেকেই ফাঁকি দিয়ে চোরের মতো খানিকটা সুখের নির্যাস পান করল। রূপকথাকে উপলক্ষ করে আনিসের সাথে এই যে একটা নৈকট্যের উষ্ণতা দিপা উপভোগ করছিল, বহুকাল পরে প্রথমবার নিজের রক্ত চলাচলের স্বাভাবিক গতি টের পেল। অনেকদিন বন্ধ হয়ে থাকা একটা ঘর দরজা খোলার পর বাইরে আলোবাতাস পেয়ে যেভাবে অনভ্যস্ত ও দ্বিধাগ্রস্থ ভাললাগায় আলোকিত হয়ে ওঠে, খানিকটা সে রকমই। প্রথমে ফ্যান্টাসি কিংডম, তারপর ওয়াটার পার্ক। রূপকথা উচ্ছ্বসিত। দিপারও ভাল লাগছিল রূপকথার আনন্দ দেখে। 

এরপর আরও নানাভাবে আনিস দিপা কাছাকাছি এসেছে। এইচ এস সি র পর রূপকথা চান্স হল খুলনা ইউনিভার্সিটিতে। রূপকথাকে প্রথম ইউনিভার্সিটিতে দিয়ে ফিরে আসার সময় দিপা কাঁদছিল। আনিসই ওর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়। বেদনার সান্ত্বনার একপর্যায়ে দিপাই মাথা রাখে ওর বুকে। এই নৈকট্যের উষ্ণতা, শারীরিক সান্নিধ্যটুকু দিপা নিয়েছিল। এমনকী এক সময় আনিসের দ্বিধাগ্রস্ত চুম্বনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করল। অভাবিত ছিল, তবু শরীর চাইছিল বলে করল। শরীর মাঝে মাঝে তার প্রাপ্য আদায় করে নেয়। এই মুক্ত আকাশের নীচে কোথাও কোনও মিথ্যের ছায়া ছিল না বলেই শরীর তার চাহিদা মিটিয়ে নিল। এক সময় আনিস উদ্বিগ্নভাবে জিজ্ঞেস করল-মাথার যন্ত্রণাটা কমেছে? দিপা চোখ বন্ধ করে বলল-‘ভুলে যাও’। তবু কেন ডিঙোনা গেল না গণ্ডিটা? দিপা আজও জিজ্ঞেস করে নিজেকে। তবু কেন সে শেষ পর্যন্ত দীপ নামের খোলসের অড়ালে নিজেকে বন্দী করে ফেলল!
তার কল্পনার সেই বর্মটা ভাঙ্গার চেষ্টা করেছিল রূপকথা। কিন্তু মায়ের পর্বতপ্রমান দৃঢ়তার কাছে হার মানতে হয়। তারপরও দিপার একাকীত্ব মোছার প্রতিজ্ঞায় নাছোড়বান্দা রূপকথা শেষ চেষ্টা করেছিল। সেবার ঈদের ছুটির পরপরই রূপকথার ক্লাস। দিপার কলেজের ছুটি ফুরাতে তখনও অনেক বাকি। যাওয়ার দিন আনিসের সামনে দিপাকে প্রস্তাব দিল কোথাও বেড়িয়ে আসার।
দিপার সাড়া না পেয়ে শেষে আনিসকেই ধরল,

: যাও না আঙ্কেল, তুমি আর মা এই ক’দিন কোথাও থেকে বেড়িয়ে এসো। আমি থাকব না, মা একা বাড়িতে, মনটা খুব খচখচ করছে। দিপা চুপচাপ শুনল। মনে হল নিজের কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। নিজেই যেন নিজেকে আর ছুঁতে পারছে না।
রূপকথা চলে যাওয়ার পর আনিস বলল,
: যাবে? 
ওর কণ্ঠস্বরে কিছু একটা ছিল, খুব গাঢ় এক কম্পন। সে কম্পন দিপাকে স্পর্শ করল, কিন্তু ও বিচলিত হল না। প্রস্তুত ছিল। বলল,
: না।
ওর উত্তর শুনে বিচলিত হল আনিস। তা হলে কি ভুল বুঝেছে দিপাকে?
:কেন যাবে না?
: তুমিও কি রূপকথার মতো ছেলেমানুষ হয়ে গেলে?
কিন্তু আনিস তখন বেপরোয়া।
: ছেলেমানুষি আর নেই বলেই বলছি।
: যে ছেলেমানুষি কাটতে বিশ বছর অপেক্ষা করতে হয়, তা না কাটাই ভাল। দিপা হালকাভাবে বলল।
: তোমাকে বুঝতে অনেকটা সময় লেগেছে। মনে হত, রূপকথার জন্যেই তুমি একটা জায়গায় আটকে রেখেছ নিজেকে। তাই আমি তোমাকে কখনো বাধা দেইনি।
দিপা আবার উপলব্দি করল তার জন্য অযাচিত আনিসের ভালোবাসার সাগরটাকে। তার মনে হতে লাগল সে যেন ভাসছে ঢেউয়ের দোলায়। তবু কি যেন এক শক্তির বলে ঢেউয়ের ওপর থেকে তীরে পা রাখল দিপা। শক্ত মাটির তীর। স্থির অকম্পিত চোখে তাকাল।
: আসলে আমি কখনও শূন্যতা অনুভবই করিনি। জানো কেন?
: না, জানি না। কী করে জানব? তোমার সামনে এলে মনে হত একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
: আজ মনে করছ দরজাটা খুলে গেছে, সবটুকু দেখতে পাচ্ছ। দরজা অর্ধেক খুলেছে আনিস। বাকি অর্ধেকের আড়ালে কী আছে জানো?
আনিস নির্বাক। দিপার দৃষ্টি অনেক দূরে কোথাও।
: আমার জীবনের সেই পাঁচটা বছর আমাকে এখনও দখল করে আছে। আমি চাইলে এখনও তাকে অনুভব করতে পারি, আমার ভেতর আমার রক্তের মধ্যে শিরশির করে। 
স্তম্ভিত মুখে তাকিয়ে আছে আনিস। ইচ্ছে করছে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে দিপার এই পাগলামির ঘোর ভেঙে দিতে। কিছুই করল না। শুধু স্বগতোক্তির মতো বলল- দীপ; তো সত্যিই আর কোথাও নেই।
: কে বলল নেই? যা আমি দেখিনি, তা মেনে নেওয়ার দরকার কী আমার? অন্য কোথাও আছে কী নেই আমার জানার দরকার নেই। আমি এখনও তাকে অনুভব করতে পারি। 
: আনিস মাথা নিচু করে চুপ করে রইল। দিপার দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হল। অদ্ভুত এক ভালবাসার বেদনায় এই প্রথম সাবলীলভাবে দিপার দু কাঁধে হাত রাখল। এই স্পর্শে কম্পন নেই, উষ্ণতা আছে।
: তোমরা যেভাবে খুশি ভাল থাকো, আমি কিন্তু সেটাই চাই।
এরপর কি বলল আনিস সেটা দিপা জানে না। শুধু দেখল-ওর ভালবাসার বৃত্তের শেষ দাগটি পার হয়ে চলে যাচ্ছে আনিস। ওর ঘরের দরজা পেরিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে ড্রইংরুমের ভেতর দিয়ে বাইরের বারান্দায়, তার পর গ্রিলের দরজা খুলে রাস্তায়-একবারও পিছনে না তাকিয়ে চলে যাচ্ছে আনিস।
সেই দেখাটাই এখনও লেগে আছে ওর চোখে।

এরপরও দিপার জীবন চলছে নিজের মতো করে। কলেজে অধ্যক্ষ পদটিতে বসতে হয়েছে জেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে। দায়িত্বের সাথে সাথে কাজের সময়ের পরিধিও বেড়েছে অনেক। রূপকথা ভার্সিটিতে চলে যাবার পর এখন প্রায়ই ওর ঘরে গিয়ে বসে থাকে দিপা। তবে এখনও ড্রইংরুমের আলো জ্বেলে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে আবার অনেকদিন পর পর ওর মনে হয়, ওপরে কেউ অপেক্ষা করে আছে।


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top