Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , সময়- ২:১৫ পূর্বাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
খালেদা জিয়ার চিকিৎসা বিতর্ক কেন ? বিএনপি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাত শেষে যা বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী | প্রজন্মকণ্ঠ পছন্দের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আবেদন খালেদা জিয়ার | প্রজন্মকণ্ঠ খালেদা জিয়া কারাগারের বাইরে থাকার সময়ও জনগণ তার ডাকে সাড়া দেয়নি : ওবায়দুল কাদের বিএনপি-জামায়াত ক্লিনহার্ট অপারেশন চালিয়ে আ'লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে নির্যাতনের শিকার করেছিল : প্রধানমন্ত্রী  ধর্মমন্ত্রী ও ভূমিমন্ত্রীর  কড়া সমালোচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রিজভীর নেতৃত্বে মিছিল করেছে বিএনপি আ'লীগের প্রতিনিধিদলের উত্তরবঙ্গ সফর শুরু । প্রজন্মকণ্ঠ   বিজিবি-বিএসএফ সম্মেলন : সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার অঙ্গীকার | প্রজন্মকণ্ঠ  সেমিফাইনাল নিশ্চিত করতে মাঠে নামছে স্বাগতিক বাংলাদেশ, আগামীকাল | প্রজন্মকণ্ঠ

মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক কিছুই এখনো সরকারের চোখের আড়ালে 


জোবাইদা নাসরীন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

আপডেট সময়: ২ এপ্রিল ২০১৮ ১:৫৮ পিএম:
মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক কিছুই এখনো সরকারের চোখের আড়ালে 

সদ্য প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী যে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেতেন না, সেটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানতেন না। মন্ত্রী, আমলা, রাজনৈতিক নেতাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার খই ফুটলেও মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক কিছুই এখনো সরকারের চোখের আড়াল হয়ে আছে। ১৯৭১ থেকে ২০১৮-এই ৪৭ বছরের ব্যবধান আমাদের যোদ্ধা করে রাখলেও চেতনাটি অনেকেরই জীবনযুদ্ধ থামাতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধ নিঃসন্দেহে এ দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অহংকারের, গর্বের। আরও গর্বের বিষয় হলো এ দেশ যে দেশপ্রেমিকদের ধারণ করেছিল, তাঁরা এই প্রজন্মের কাছে যেমন শ্রদ্ধার, তেমনি পৃথিবীর কাছেও ঈর্ষণীয়। দেশের বীর সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধায় এ দেশের মানুষ সব সময়ই নত। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জিগির যতটা, কাজ তত বেশি হয়নি, রাজনৈতিক মাতব্বরি বারবার ছড়ি ঘুরিয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বেড়েছে, কোটাসহ বেড়েছে নানা আশ্বাস। এত কিছুর পরও অভিমান পুষে রাখা ক্ষত হলো ৪৭ বছর বয়সী বাংলাদেশ আজও তার কারিগরদের তালিকা প্রস্তুত করতে পারেনি। এই রাষ্ট্রটি ‘আসল’-‘নকল’ মুক্তিযোদ্ধাদের আজও আলাদা করতে পারেনি। বিভিন্ন সরকারের আমলে এই তালিকার পরিবর্তন হয়েছে। নতুন সরকার এলেই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা পরিবর্তন হয়। বেড়ে যায় সংখ্যাও।

৪৭ বছরে ছয়বার মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার বয়স, সংজ্ঞা ও মানদণ্ড ১১ বার পাল্টেছে। সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বয়সসীমা ছয় মাস কমানো হয়। অর্থাৎ সাড়ে ১২ বছরের গেজেটভুক্ত সবাই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স নিয়ে এই সিদ্ধান্তের আগে গত বছরের ১২ জানুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে কমিটি করার গেজেট প্রকাশ করা হয় (সূত্র: প্রথম আলো, ১২ মার্চ ২০১৮)।

এমনকি তিন দফা পরিবর্তন হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা সনদের নমুনা। সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে সনদ প্রদানের কর্তৃত্ব এবং কর্তৃপক্ষেরও। দুই সরকারের সময়ে সনদ এবং মুক্তিযুদ্ধের পরপরই মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গনি ওসমানী স্বাক্ষরিত সনদ পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাসহ দেশে এখন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখের বেশি।

মুক্তিযুদ্ধের পরপরই প্রথম সনদটি দেয় দেশ রক্ষা বিভাগ। সেখানে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বীর/বীরাঙ্গনা সৈনিক’ বাক্যটি ছিল। পরবর্তী দুটি পরিবর্তিত সংস্করণে এই বাক্য তুলে দেওয়া হয়।

গত বছর বাদ পড়া মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে আবেদনপত্র চাওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে অনলাইনে ও সরাসরি আরও দেড় লাখ আবেদন জমা পড়ে।

তাঁদের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে প্রায় ২৫ হাজার নাম পাঠানো হয়। ১১ মার্চ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ মেনে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে সরকার। দেশের জেলা-উপজেলা থেকে যাচাই-বাছাই কমিটি যেসব তালিকা পাঠিয়েছে, তা ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ হওয়ায় আকস্মিক এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়।

সর্বশেষ হিসাবমতে, এসব কমিটিতে স্থানীয় সাংসদ, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ মন্ত্রণালয় বা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধি ছিলেন। ৪৭২টি উপজেলা ও ৮টি মহানগর কমিটি কাজ শুরু করে গত বছরের ২১ জানুয়ারি। এর মধ্যে ৩৬৫টি কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে, বাকি প্রতিবেদনগুলো জমা পড়েনি।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এখন থেকে কোনো মুক্তিযোদ্ধার নাম ‘লাল মুক্তিবার্তা’ অথবা ভারতীয় তালিকায় থাকলে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘লাল মুক্তিবার্তা’ অথবা ভারতীয় তালিকার সঙ্গে তা মিলিয়ে নেবে। দুটি মিলে গেলে তা ‘যোগ্য’ বলে বিবেচিত হবে।

প্রতিটি উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে এই কমিটি করা হয়েছিল। পদাধিকার বলে সদস্যসচিব থাকা এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কেউই মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি। এর বাইরে বিভিন্ন এলাকা থেকে কমান্ডার ও কমিটির সদস্যদের থেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদ পেতে অর্থের লেনদেন হয়েছে বলেও পত্রিকায় অভিযোগ এসেছে।

পত্রিকার খবর থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় হাজার পাঁচেক ব্যক্তির নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। তবে কোন বিবেচনায় নতুন অন্তর্ভুক্তির ইচ্ছা এবং অন্তর্ভুক্ত করতে হলেও সেই সংখ্যা কেন পাঁচ হাজার, সেটি মন্ত্রণালয় খোলাসা করেনি।

যাঁরা সনদ পাননি, নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের সবারই তা পাওয়ার কথা। তাহলে মন্ত্রণালয় কি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে এই সংখ্যা কত হবে? মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণাকাজ পরিচালনা করতে গিয়ে জানা গেছে, নতুন করে সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে লাল মুক্তিবার্তাকে একমাত্র সূত্র ধরায় যাঁরা দেশের মধ্যে থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন কিংবা সংগঠক থেকেছেন, তাঁরা অনেকেই এখনো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।

কোনো কোনো মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীনের পরপরই মারা গেছেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সনদ নেননি। এখন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সেই সনদ নিতে চাইলে সেটিও পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ছে। কারণ তাঁদের সাক্ষ্য জোগাড় করতে হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা আসায় পূর্বে সনদ অগ্রাহ্য করা মুক্তিযোদ্ধারা যেমন নড়াচড়া করছেন; তেমনি যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ করেননি, তাঁদের অনেকেই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, বারবার পরিবর্তন করা এবং সর্বশেষ সংজ্ঞার কারণে অনেক মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়েছেন। বাদ পড়েছেন অনেক শহীদ বুদ্ধিজীবীও। কারণ শহীদের সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তিত সংজ্ঞার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য জায়গার কোনো শহীদ বুদ্ধিজীবী এখনো এই ‘শহীদ’ তালিকায় গেজেটেড হননি। যাঁরা সমরে যুদ্ধ না করেও বিভিন্ন কাজের কারণে পাকিস্তানিদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন; পাবলিক ও মিডিয়ার স্মৃতিতে তাঁরা সব সময় থাকলেও সরকারি সংজ্ঞায় তাঁরা ‘শহীদ’ শামিয়ানায় অবস্থান করেন না। কারণ, শহীদ সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সরকার গুরুত্ব দিয়েছে সমরযুদ্ধের দিকে।

শহীদ যোদ্ধা কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, সেটি উল্লেখ করতে হবে। এই সংজ্ঞার কারণে বাদ পড়েছেন ২৫ মার্চের গণহত্যাসহ অন্যান্যভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও নিপীড়ন এবং ব্রাশফায়ারে নিহত অনেক শহীদ। আর এভাবেই রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ সংজ্ঞায়নের সংঘর্ষ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রটির সবচেয়ে সাহস, শক্তি, ভালোবাসা আর মায়ার দিক এই মুক্তিযুদ্ধ, যা না হলে একটি স্বাধীন দেশ আমরা পেতাম না। কিন্তু অর্ধশত বছরের দ্বারপ্রান্তে এসেও মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকা মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়।

জোবাইদা নাসরীন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক

zobaidanasreen@gmail.com


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top