Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ , সময়- ৯:৪৩ অপরাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
নির্বাচন বানচাল করার জন্য বিনা উস্কানিতে এই নাশকতা : ওবায়দুল কাদের কী ঘটেছে রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনে ? দেশকে এগিয়ে নিতে বিশ্বাসঘাতকদের প্রয়োজন নেই : শেখ হাসিনা রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশ-বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হেভিওয়েট প্রার্থীরা কে লড়বেন কার বিপক্ষে ভোটের মাঠে  নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে হয়রানি ও গায়েবি মামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে : মির্জা ফখরুল সপ্তাহব্যাপী জাতীয় আয়কর মেলার দ্বিতীয় দিন শেষ হলো সপ্তাহব্যাপী জাতীয় আয়কর মেলার দ্বিতীয় দিন শেষ হলো জাতীয় পার্টির মুখপাত্রের দায়িত্ব পেয়েছেন রুহুল আমীন হাওলাদার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গণভবনে শুরু 

মনের চিকিৎসা বনে


প্রজন্মকণ্ঠ অনলাইন রিপোর্ট

আপডেট সময়: ৫ নভেম্বর ২০১৮ ৫:৫৬ পিএম:
মনের চিকিৎসা বনে

জয়া ফারহানা, উপ-সম্পাদকীয় : বনের সবুজে মনের সবুজ ফিরে পাওয়ার নাম বন বা জঙ্গল থেরাপি। কোনো নগরপ্রেমিক প্রশ্ন তুলতে পারেন—জঙ্গলে গাছ, জন্তু-জানোয়ার কিংবা কিছু পোকামাকড় ছাড়া এমন কী-ই বা আছে, যা মনের চিকিৎসা করতে পারে? সঙ্গে আছে জঙ্গলের গোলকধাঁধার পথে হারিয়ে যাওয়ার ভয়। তা ছাড়া হিংস্র সব পশুর পায়ে পৈশাচিক পিষ্ট না হওয়ার নিশ্চয়তাই বা কই? আমরা দেখছি, উল্টোটাই সত্য। বন নয়, হিংস্র জীবের হিংসার ভয়াবহতা নগরেই বেশি। বন নিয়ে প্রচুর ভুল ধারণা আছে আমাদের। বন নিস্তরঙ্গ শান্তির জায়গা। নিতান্ত নরখেকো অপবাদ পাওয়া বাঘও এখানে খিদে না পেলে শিকারের ওপর চড়াও হয় না। মানুষ কিন্তু হয়। বনে পথ হারালে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ। নগরজীবনে সেই সম্ভাবনা নেই। আসল-নকলের গোলকধাঁধায় সোজা-সরল মানুষেরা প্রায়ই পথ হারায় নগরে। একবার পথ হারিয়ে ফেললে আর খুঁজেও পায় না। ছিটকে পড়ে প্রবল প্রতিযোগিতার নাগরিক পথ থেকে! ‘রং ভরা এ শহরে যতই দেখেছি, গোলকধাঁধার চক্করে ততই পড়েছি।’ ‘পিচ ঢালা পথ’ চলচ্চিত্রের সেই গানের কথা মনে আছে তো? যেখানে ছোট ছোট মানুষের অন্ন কেড়ে বড় বড় বাড়িগুলো আরো বড় হয়ে ওঠার কথা আছে। যা হোক, নগরে পথ হারালে পথ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি বলে কথা। এখন বাজার ও গলির সঙ্গে বেড়েছে প্রতারণা। নাগরিক জীবন হয়েছে অধিকতর যন্ত্রণাময়। জটিল নগরে সরলদের পথ থেকে ছিটকে পড়ার আশঙ্কা তাই বেড়েছে। হতে পারে জঙ্গল থেরাপি সরল মানুষদের জন্যই। নগরজীবনে হাজারটা প্রতারণার শিকার সরল মন যখন মুমূর্ষু, তখন বন-জঙ্গলই পরম আশ্রয়। বনে প্রবেশ করলে শরীরের প্রতিটি লোমকূপ দিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত শুষে নেওয়ার সুযোগ থাকে। যারা ভাবেন, বন-জঙ্গলে গাছ আর জন্তু-জানোয়ার ছাড়া আছে কী? তাঁদের জন্য বলি, বনের পথে যেতে যেতে যখন সারি সারি গাছ হৈ হৈ করে চোখের সামনে দিয়ে শাঁ শাঁ করে চলে যায়, রোদ যখন সুন্দরী গাছের পাতার শামিয়ানা ভেদ করে পাতাদের আদর করতে করতে বিকেল নামিয়ে দেয় এবং সেই আদরে-আহ্লাদে আটখানা হয়ে হলুদ বন যখন সবুজ থেকে তীব্র সবুজ হয়ে ক্রমেই অন্ধকার নামিয়ে দেয়, সেই দৃশ্য এক আশ্চর্য আবিষ্কার। এখানে বৃক্ষ আর সূর্য মিলে দিন-রাত আলোছায়ার অপূর্ব খেলা। অনুষঙ্গ দুটি মাত্র; কিন্তু বৈচিত্র্য অসীম। ভোরের আলোয় দেখা নিঃসঙ্গ নারিকেলগাছ বদলে যায় মধ্যাহ্নে। সন্ধ্যার ছায়ায় আবার সেই নিঃসঙ্গ গাছটিরই মগডালে আশ্রয় নেয় শঙ্খচিল। প্রতিটি দৃশ্যেরই আছে ভিন্ন রকম সৌন্দর্য। ভোরের পাখির ডাক আর মধ্যাহ্নের পাখির ডাক এক নয়। সন্ধ্যায় নদীর জল আর সকালের নদীর জলের রং এক নয়। তরঙ্গও এক নয়। আর জোয়ার-ভাটার খেলা তো আছেই। মানুষের মতো বিনা কারণে শোরগোল করার অভ্যাস বনের প্রাণীদের নেই। অনন্ত নীরবতায় কত রকম পাখির ডাক যে শোনা যায়! পাতার মধ্যে হাওয়ার সরসর শব্দ, সঙ্গীহীন কোনো প্রাণীর সঙ্গীকে খুঁজে পাওয়ার আর্তি। বানর কিংবা হরিণের বিপৎকালীন ডাক ঠিক বাতাসে কান পাতলে এক অভিনব জগতের দিনযাপনের কাহিনি শোনা যায়। নির্বাক বৃক্ষ অথচ তারা সহস্র কণ্ঠে কথা বলছে। শুধু শোনার কান থাকা চাই। জঙ্গলযাত্রা তাই মোটেই একঘেয়ে ক্লান্তিকর নয়।

দুই. লুই ক্যারলের অ্যালিসের গল্প মনে পড়ে? ছোট্ট মেয়ে অ্যালিস এক দুপুরে একটি সাদা ওয়েস্ট কোট আর ঘড়ি পরা খরগোশের পেছন পেছন ছুটতে গিয়ে এক বিরাট গর্তে পড়ে গেল। গড়িয়ে পড়তে পড়তে ছোট্ট অ্যালিস ভাবছে, সে কি পৃথিবী ভেদ করে অন্য দেশে চলে এলো? কত মাইল পেছনে চলে এসেছে সে, পৃথিবী ছেড়ে? চার হাজার, পাঁচ হাজার, দশ হাজার মাইল? নাকি আরো বেশি? ভাবতে ভাবতে অ্যালিস যেখানে পড়ল, সেখানে শুধুই শেওলা পড়া সবুজ রঙের ঝরা পাতার গালিচা, পাশেই বিশাল সরোবর। অ্যালিস ভাবল, সে এসে পড়েছে অনেক অনেক দূরের এক দেশে। যেখানে সোয়ালো পাখিরা শীত কাটায়, নরম ঘাসফড়িং খালের পাশে গালে হাত দিয়ে ভাবে এবং সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যেখানে রোদ পৌঁছে না। যেখানে হাজার হাজার রাজহাঁস চওড়া ডানা মেলে থাকে মাটিতে। সমুদ্রের পাখি জলের ওপর বাতাস কেটে কেটে ভেসে থাকে। ছোট্ট পাঠক পড়তে গিয়ে ভাবত, এমন দেশ সত্যি কি কোথাও আছে? ছোট পাঠকটি যখন বয়স্ক পাঠক, তখন সে বুঝে যায়, এমন দেশ পৃথিবীতে আছে বৈকি। সেই দেশটিই সুন্দরবন। যেখানে নদীর স্রোতে ত্রিমোহনা বা বাঁকের মুখে দেখা যায় চড়ার ওপর কেওড়াগাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে হরিণ, কখনো ডাল থেকে বানর ছুড়ে দিচ্ছে কেওড়া ফল আর তা খাচ্ছে হরিণ। শাস্ত্রে ৯ জাতির মৃগের কথা আছে। একসময় সুন্দরবনে এই ৯ ধরনের মৃগই দেখা যেত। এখন মৃগজাতীয় প্রাণীর মধ্যে আছে শুধু হরিণ। জোয়ারের জল সরে যাওয়া মাত্র যখন কেওড়ার তলা জেগে ওঠে, তখন পাল পাল হরিণ সেই কেওড়াতলায় আসে। হরিণ শিকার নিষিদ্ধ। তবু এখনো এই কেওড়াতলায় শিকারিদের গুলিতে হরিণ মারা যায়। কেউ কেউ ‘গাছাল’ দিয়েও হরিণ শিকার করে। কত বিচিত্র রুচি মানুষের! অপূর্ব রূপসী একটি প্রাণী কেওড়াতলায় যখন বিশ্রামের সুখ উপভোগ করছে, ঠিক তখন কোনো শিকারি হয়তো ভাবছে, হরিণের মাংসে চর্বি কম, একটু বাসি না হলে স্বাদ পূর্ণ হয় না! সৌন্দর্য নয়, মাধুর্য নয়—এদের উৎসব প্রাণী হত্যায়। ভালো হতো যদি বন এদের মনের চিকিৎসা করতে পারত। অকূল জলরাশি ধূমাকারে ধু ধু করছে। বেলাভূমির ওপরের চরে কেওড়াপাতার গালিচা। দূর থেকে দেখে মনে হয় কেউ একজন আদিগন্ত একটি হলুদ কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে। কোথাও আবার অ্যালিসের দেখা শ্যাওলা পড়া সবুজ রঙের ঝরা পাতার গালিচা। কোথাও বলার ঝোপ সুন্দরী বা হিন্তাল স্রোতের ওপর ঝুঁকে পড়ে তীরভূমি অন্ধকার করে রেখেছে। এখানে, এই সুন্দরবনে, এই হরিণঘাটার মোহনায়—যেখানে ‘চাঁদের আড়া’ পশ্চিম দিক থেকে এসে কালিদহের খালে মিশেছে, এখানেই ছিল চাঁদ সওদাগরের পোতাশ্রয়। ভাবতে ভালো লাগে, এই হরিণঘাটার মোহনায় একদিন চাঁদ সওদাগর ভিড়িয়েছিলেন তাঁর বাণিজ্যিক ডিঙা। পাঠান আমলে এখানেই তৈরি হয়েছিল মসজিদ, প্রতাপাদিত্যের কালে শিবমন্দির। রাজা বসন্ত রায়, যিনি কবিও ছিলেন, যাঁর কবিপ্রতিভা যশোরকে যশোহর করেছিল, তিনিও একটি শিবমন্দির নির্মাণ করেছিলেন। বেদকাশির পূর্ব-দক্ষিণে, যেখানে শিবসা নদীর দ্বিধাবিভক্ত প্রবাহদ্বয় মিলিত হয়ে মর্জাল নাম নিয়ে ত্রিমোহনায় মিশেছিল, সেখানে বসন্ত রায় নির্মাণ করেছিলেন অট্টালিকা। সময়ান্তরে সেসবের কিছুই অবশিষ্ট নেই আর। এমনকি ভগ্নাবশেষও নয়।  

তিন. যেখানে জঙ্গল নেই, সেখানে অতিবৃষ্টি ভীষণ অনিষ্টকর। বক্ষহীন বনহীন ভূমি অতিবৃষ্টিতে ভেসে যায়। যেখানে বন, সেখানে ধানের প্রাচুর্য, শস্যের প্রাচুর্য, মাছ ও নদীসম্পদের প্রাচুর্য। সুন্দরবনের কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চল পরিণত হয়েছে শস্যভাণ্ডারে। 

চার. এত স্নিগ্ধ নদী কাহার? কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়? কোথায় এমন হরিৎ ক্ষেত্র আকাশতলে মেশে? এমন ধানের ওপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে? দুর্ভাগ্য, প্রকৃতির এমন অকৃপণ ঐশ্বরিক দান পেয়েও মনে আমরা কৃপণ, হিংসাপ্রবণ এবং প্রতিশোধপরায়ণ থেকে গেলাম। এমন উদার বনও আমাদের মনকে উদার করতে পারল না!

লেখক : কথাসাহিত্যিক

 


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top